আজ শুধু ভালোবাসার দিন

বিনোদন রিপোর্টার : ‘মহাশূন্যের কোল থেকে আসা কণ্ঠধ্বনি/স্বপ্নে স্পর্শ/অনুভবে শিহরণ আর সত্তায় অনুরণন/করেছে তোমায় অনুপস্থিত/ওই কাজল কালো আঁখিযুগল/ভেজানো কোমল ঠোঁটের ছোঁয়া-/শিহরণ জাগায় প্রাণে/স্মিতা, তুমি সত্যিই অপরাজিতা’।

কে এ অপরাজিতা! চিরজনমের বাহু-ডোরাবদ্ধ কিংবা হৃদয়বেদীতে যার জন্য থরে থরে সাজানো পূজোর অর্ঘ্য, মোহ আর ভালোবাসার দেবী যে, সেই প্রিয়াই তো! পৃথিবীর তাবৎ বনলতা সেন অথবা মোনালিসা কিংবা মানসীকে উৎসর্গিত তরুণ কবির এ পঙ্ক্তিমালা শুধুই কি মোহ আর মায়াচ্ছলে? নাকি ভালোবাসারও! হ্যাঁ, ভালোবাসারই।

স্নেহ, প্রীতি-বন্ধন, প্রেম আর কৃতজ্ঞতা-শ্রদ্ধায় গড়া আমাদের এ নিত্য। এগুলোকে যদি একশব্দে বাঁধি, তাকেই বলব ‘ভালোবাসা’। পিতামাতার প্রতি সন্তানের, সন্তানের প্রতি পিতামাতার, ভাইবোনের পারস্পরিক, স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির কিংবা সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার অথবা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত প্রিয়-প্রিয়ার এ যে হরেক রকমের সম্পর্ক সেটাই তো ভালোবাসা! কিন্তু ভালোবাসার জন্য কি বিশেষ কোনো দিনের দরকার! তারপরও পৃথিবীর তাবৎ প্রেমিক-প্রেমিকারা একটি দিন পালন করে আসছে।

প্রিয়ার মাঝে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সেই দিনটিই আজ। ‘আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’। ‘হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে’। এদিকে বুধবার বাসন্তী আর হলুদ রংয়ে ছেয়ে গিয়েছিল দেশ। ফাগুনের প্রথম প্রহরে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নিতে ছিল নানা আয়োজন। সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে বেঙ্গল পরম্পরার যন্ত্রসহযোগে ধ্রুপদী সঙ্গীতের মূর্ছনায় শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

ভালোবাসা দিবস নিয়ে সচেতন মহলে বিতর্কের শেষ নেই। বলা হয়ে থাকে, কর্পোরেট দুনিয়া তাদের পণ্যের বেচাবিক্রির লক্ষ্যে ব্যবসায়িক স্বার্থে একটি দিনের প্রসার-প্রচার ঘটাতেই পারে। কিন্তু বিশ্বায়নের প্রভাবে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদী এ সময়ে বিশেষ দিন উপলক্ষে যদি সম্পর্কটাকে ফের ঝালাই করে নেয়া যায় তাহলে তা কম কিসে?

ভালোবাসা দিবস প্রবর্তনের গোড়া থেকেই বিশ্বব্যাপী দিনটি নিয়ে তরুণ প্রজম্মকেই বেশি মাতামাতি করতে দেখা যায়। ভালোবাসার বহুমাত্রিকার দৃষ্টিকোণ থেকে দিনটি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবারই। কিন্তু প্রধানত তারুণ্যের জয়জয়কার দেখা যায় এদিন।

একই ধারাবাহিকতায় আজকেও হয়তো লজ্জা, সংকোচ আর ভীরুতা কাটিয়ে হৃদয়ের গহিনে অনেক দিনের সঞ্চিত প্রিয় বাক্য ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলে ফেলতে পারেন কেউ। বুধবার ধরণীতে শুরু হয়েছে বসন্তের উতল হাওয়া।

নব দখিনা সমীরণে পাগল হৃদয় ইতিমধ্যে দারুণ প্রেমকাতর। বসন্তের সৌরভ ছড়ানো আজকের ভালোবাসা দিবসে প্রেমদেব হৃদয়বন্দর থেকে তুলে আনা রক্তরাঙা গোলাপটি তুলে দেবে প্রিয়ার হাতে।

অনুরাগতাড়িত হৃদয় হবে এফোঁড়-ওফোঁড়। মনে লাগবে দোলা, ভালোবাসার রঙে রাঙাবে হৃদয়। হিয়ার মাঝে বেজে উঠবে-‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল।’ অথবা প্রিয়বন্ধনটি আরও গাঢ়তর করার জন্য চণ্ডীদাসের সুরে বলে উঠবে- ‘দুঁহু তার দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া/অর্ধতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া/সখি কেমনে বাঁধিব হিয়াঃ।’

ভালোবাসা দিবস উদযাপনের ইতিহাস বেশ পুরনো। এ নিয়ে একাধিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি যে গল্পটি প্রচলিত সেটি হচ্ছে- সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে একজন রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজকের ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের একটি ঘটনা নিয়ে।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে ওই ধর্মযাজক একই সঙ্গে চিকিৎসক ছিলেন। তখন রোমান সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় ক্লডিয়াস। বিশ্বজয়ী রোমানরা একের পর এক রাষ্ট্র জয় করে চলেছে। যুদ্ধের জন্য রাষ্ট্রে বিশাল সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলা দরকার।

কিন্তু লোকজন বিশেষ করে তরুণরা এতে উৎসাহী নয়। সম্রাটের ধারণা হল- পুরুষরা বিয়ে করতে না পারলে যুদ্ধে যেতে রাজি হবে। তিনি যুবকদের জন্য বিয়ে নিষিদ্ধ করলেন। কিন্তু প্রেমপিয়াসী তারুণ্যকে কি নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ করা যায়! এগিয়ে এলেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। ভ্যালেন্টাইন প্রেমাসক্ত যুবক-যুবতীদের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন।

চার্চের মোমবাতির নিয়ন আলোয় হচ্ছে তাদের স্বপ্নিল বাসর। ধরা পড়লেন একদিন ভ্যালেন্টাইন। তাকে জেলে পোরা হল। দেশময় এ খবর ছড়িয়ে পড়লে যুবকশ্রেণীর মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। অনেকেই ভ্যালেন্টাইনকে জেলখানায় দেখতে যান। ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে আসেন।

কারাগারের জেলারের এক অন্ধ যুবতী মেয়েও ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাতে যেতেন। চিকিৎসক ভ্যালেন্টাইন মেয়েটির অন্ধত্ব দূর করলেন। তাদের মধ্যেও সৃষ্টি হল হৃদয়ের বন্ধন। ধর্মযাজক নিয়ম ভেঙে প্রেম করেন। তারপর আইন ভেঙে তিনিও বিয়ে করেন।

যুবক-যুবতীদের সহানুভূতি আর ভ্যালেন্টাইনের নিজেরও প্রেম-বিয়ের এ খবর যায় সম্রাটের কানে। তিনি ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন। সেটি ছিল ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের আজকের এ ১৪ ফেব্রুয়ারি।

ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে নবোঢ়াকে উদ্দেশ করে তিনি চিঠি লিখলেন। যার হৃদয়ের কথা শেষ হয়েছিল এভাবে- ‘লাভ ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন’। অতপর এ ভালোবাসার স্বীকৃতি আদায়ে পরবর্তী দুই শতাব্দী নীরবে-নিভৃতে পালন করতে হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি। ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে রোমের রাজা পপ জেলুসিয়াস এ দিনটিকে ‘ভ্যালেন্টাইন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

তবে গ্রিক ও রোমান উপকথার মতোই ভালোবাসা দিবসের উৎপত্তি নিয়ে যে গল্প-কাহিনীই থাক, আজ যে তা ছড়িয়ে পড়েছে ভুবনজুড়ে। ইউরোপীয় ঘরানার এ দিবসটি এ দেশে হালে উদযাপিত হলেও সেই ষোড়শ শতক থেকে তা পাশ্চাত্যে পালিত হয়ে আসছে।

এদিন শুধু প্রেম বিনিময় নয়, তরুণ-তরুণীদের মাঝে গোপনে বিয়েও ঘটে। রাজধানীর বিভিন্ন উদ্যান, বাংলা একাডেমির বইমেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, কফিশপ, ফাস্টফুড শপ, লংড্রাইভ অথবা নির্জন গৃহকোণে একান্ত নিভৃতে প্রণয়কাতর যুবক-যুবতীদের অভিসার চলে।

Check Also

আজ শুধু ভালোবাসার দিন

অনলাইন ডেস্ক : আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আজ শুধু ভালোবাসার দিন। ভালো লাগার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *