এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। ১২৮০ বঙ্গাব্দের (১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দ) জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বঙ্কিম সহোদর পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মধুমতী’ গল্প দিয়েই বাংলা গল্পের যাত্রা শুরু। অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৭)। তবে উপন্যাসে নবযুগের সূত্রপাত ঘটে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫) প্রকাশের মধ্য দিয়ে।… কল্লোল যুগে বাংলা কথাসাহিত্য নতুন মাত্রা পায়। এই মাধ্যমটির মানচিত্র প্রসারিত হয়। নিচুতলার মানুষদের জীবন উঠে আসে কথাসাহিত্যে।… বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের প্রসঙ্গে বলা যায়, পঞ্চাশের দশকে কথাসাহিত্য হয়ে ওঠে মৃত্তিকাস্পর্শী ও জাতিসত্তার শিকড়সন্ধানী। ষাট দশকে এদেশের কথাসাহিত্যে সূচিত হয় নতুন স্রোত। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কল্লোল আর সংঘাতের পটে রচিত হয় গল্প-উপন্যাস। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কথাসাহিত্যে লক্ষ করা যায় নতুন নতুন নিরীক্ষা আর বাঁক।
এই পটভূমিতে ২০১৫ সালে প্রবর্তিত হয় ‘এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার’। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এই পুরস্কার এদেশের প্রবীণ এবং নবীনÑএই দুই শ্রেণির কথাসাহিত্যিকদেরই অনুপ্রাণিত করবে। এই বছর এ পুরস্কার পেয়েছেন দুজন লেখকÑসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য প্রবীণ কথাশিল্পী রিজিয়া রহমান এবং নবীন সাহিত্যশ্রেণিতে (অনূর্ধ্ব চল্লিশ বছর বয়স্ক লেখক) ফাতিমা রুমি। তাঁরা পুরস্কার হিসেবে পাবেন যথাক্রমে পাঁচ লাখ এবং এক লাখ টাকা। এছাড়া প্রদান করা হবে ক্রেস্ট, উত্তরীয় এবং সার্টিফিকেট। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে এই দুটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছিলেন যথাক্রমে শওকত আলী এবং সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম। ২০১৬ সালে পুরস্কৃত হয়েছিলেন হাসান আজিজুল হক এবং স্বকৃত নোমান। অন্যদিকে ২০১৭ সালে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছিল জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত এবং মোজাফ্ফর হোসেনের হাতে।
২০১৮ সালের পুরস্কার বিজয়ী দুজনের নাম সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় আজ ৩ নভেম্বর, শনিবার, বিকেলে, শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টির সভাকক্ষে। এই সময় উপস্থিত ছিলেন অন্যদিন সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং এক্সিম ব্যাংকের অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স এন্ড ব্র্যান্ডিং ডিভিশন, মি. সঞ্জীব চ্যাটার্জি। উল্লেখ্য, আগামী ১২ নভেম্বর, সোমবার, বিকেলে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পুরস্কার প্রদান করা হবে।

রিজিয়া রহমান
এদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ এক কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান। তাঁর গল্প-উপন্যাসে এদেশের মানুষের সংগ্রাম মূর্ত হয়ে ওঠে। গণমানুষের যাপিত জীবন, চারপাশের অসংগতি ও বৈষম্য ধরা পড়ে তাঁর সাহিত্য দর্পণে। সময়ের উত্তাপ, ইতিহাসের নানা অধ্যায় ও মানুষের দ্রোহও অপূর্ব ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত তাঁর লেখায়।

রিজিয়া রহমানের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর, কলকাতার ভবানীপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। কর্মজীবনের শুরু সাহিত্য পত্রিকা ‘ত্রিভুজ’-এর সম্পাদক হিসেবে। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় জাদুঘরের পরিচালনা বোর্ডের ট্রাস্টি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্যপরিচালক হিসেবে। তিন বছর বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রিজিয়া রহমানের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে : গল্পগ্রন্থ-অগ্নিস্বাক্ষরা (১৯৬৭), নির্বাচিত গল্প (১৯৭৮), চার দশকের গল্প (২০১১), দূরে কোথাও…। উপন্যাস- উত্তর পুরুষ (১৯৭৭), রক্তের অক্ষর (১৯৭৮), বং থেকে বাংলা (১৯৭৮), অলিখিত উপাখ্যান (১৯৮০), শিলায় শিলায় আগুন (১৯৮০), সূর্য সবুজ রক্ত (১৯৮১), বাঘবন্দী (২০০৬), আবে রওয়াঁ (২০০৬), আলবুর্জের বাজ (২০১০)।
বাংলা সাহিত্যে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রিজিয়া রহমান পেয়েছেন বহু পুরস্কার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑবাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৮), হুমায়ুন কাদির সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), বাংলাদেশ লেখক সংঘ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৫), অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫)।
কথাসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ‘এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮’ পাচ্ছেন রিজিয়া রহমান।

ফাতিমা রুমি
এ সময়ের প্রতিশ্রæতিশীল কথাসাহিত্যিক ফাতিমা রুমি। জন্ম ১৯৮৪ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলায়। বাবা মো. গোলাম ওয়ারেছ। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। মা মনিকা বেগম বর্ণা।
ইডেন কলেজ থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। এখন তিনি রোজ হ্যাভেন গ্রামার স্কুলে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করছেন।
মূলত ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেন। প্রথম উপন্যাস ‘আমি অনিন্দিতা’। পরে প্রকাশিত হয়েছে আরও কয়েকটি উপন্যাস ‘অনিন্দিতা এবং একটি গল্প’, ‘এক রাতের গল্প’, ‘মেঘবালিকার মন ভালো নেই’, ‘আবছায়া’।
‘আমি অনিন্দিতা’-এর জন্য ফাতিমা রুমি ২০১৪ সালে কালি ও কলম পুরস্কার অর্জন করেছেন। এবার ‘সাঁঝবেলা’ উপন্যাসের জন্য নবীন সাহিত্যশ্রেণিতে এবছরের ‘এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮’ পাচ্ছেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘সাঁঝবেলা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে শব্দভূমি প্রকাশনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *