এবারের বিশ্বকাপে ‘ভয়ঙ্কর’ এক ব্রাজিল

স্পোর্টস ডেস্ক : বিশ্বকাপ শুরুর আর দিন কয়েক বাকি। আপনি ফুটবলপ্রেমী হলে, নিশ্চিতভাবে অন্য দলগুলোর সামর্থ্য বিচারে প্রিয় দলের সম্ভাব্য হিসাব-নিকাশ শুরু করে দিয়েছেন। যেটাই করুন না কেন, আপনার সব হিসেব গুবলেট হয়ে যেতে পারে। কারণ এবার দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে ব্রাজিল। ২০১৮ সালে এখন পর্যন্ত একটি ম্যাচেও হারেননি নেইমার-জেসুসরা। গত রাতে ৩-০ গোলে অস্ট্রিয়াকে বিধ্বস্ত করেছে সেলেসাওরা। ঘরের মাঠে গত বিশ্বকাপে সবার চোখ ছিল ব্রাজিলের ওপর। ভালো খেলে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল নেইমারের দল। তবে জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। চার বছর কেটে গেলেও, সেই দু:খটা ভুলতে পারেনি ব্রাজিল সমর্থকরা। তবে এবার সত্যিকার অর্থেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দলটি।
রাশিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বছরটা শুরু করেছিল ব্রাজিল। এরপর একে একে জার্মানি ও ক্রোয়েশিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সেরে নেয় সাম্বার দেশ। শেষ প্রস্তুতি ম্যাচটা ছিল অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। সেই পরীক্ষাতেও ভালোভাবে উতরে গেল তিতের দল। ৩-০ গোলের অসাধারণ জয় দিয়ে মূলপর্বে খেলার আনুষ্ঠানিকতা সেরে নিলো দলটি।
শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে সেরা একাদশকেই ঝালিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তিতে। সেই কারণেই শুরু থেকেই নেইমার-কৌতিনহো-জেসুস-ক্যাসিমিরো-উইলিয়ান-পলিনহোদের মাঠে নামান তিনি। শুরু থেকেই অস্ট্রিয়াকে চেপে ধরে ব্রাজিল। তবে গোল পেতে অপেক্ষা করতে হয় ৩৬ মিনিট পর্যন্ত। প্রথম গোলটি করেন গ্যাব্রিয়েল জেসুস।
বিরতির পর আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে হলুদ জার্সিধারীরা। ৬৩ মিনিটে নেইমার ম্যাজিকে ব্যবধান বাড়ায় ব্রাজিল। ছয় মিনিটের ব্যবধানে ব্যবধানটা ৩-০ করেন কৌতিনহো।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলের এমন ফর্ম কেবল গ্রুপের অন্য তিন দল সুইজারল্যান্ড, কোস্টারিকা ও সার্বিয়াকেই নয় ভাবিয়ে তুলেছে শিরোপাপ্রত্যাশী অন্য দলগুলোকেও। নেইমার-জেসুস-কৌতিনহোরা এমন ফর্মে থাকলে ব্রাজিলই যে শিরোপ জিতবে সেটা হয়তো আগ বাড়িয়ে না বললেও চলে!

 

ব্রাজিলের ‘দ্য লিটল ম্যাজিশিয়ান’ কুতিনহো
ছেলেবেলায় লাজুক প্রকৃতির কিছু ছেলে থাকে। যারা সবার সঙ্গে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করে। বিভিন্ন ধরনের কৌশল বা কোনো খেলা জেনেও অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে চায় না। ছোটবেলায় ‘ও ম্যাজিকো’ বা ‘দ্য লিটল ম্যাজিশিয়ান’ নামেই বেশি পরিচিত ফিলিপ কুতিনহোর জীবন কাহিনীটি ঠিক এমনই।


পুরো নাম ফিলিপ কুতিনহো কোরেয়া। জন্ম ব্রাজিলের রিউ ডি জেনিরোতে, ১৯৯২ সালের ১২ জুন। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা ও ব্রাজিল জাতীয় দলের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার কখনওবা উইঙ্গার হিসেবে খেলে থাকেন। বাবা হোসে কার্লোস কুতিনহো ও মা ডোনা মারেল্ডা কুতিনহোর টানাপোড়েনের সংসারে ফিলিপ শৈশব কাটিয়েছেন তার বড় দুই ভাইয়ের সঙ্গে।
ফিলিপ কুতিনহোর ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল লাজুক স্বভাব আর নিজের ভেতরের রপ্ত করা কৌশলের সমন্বয়ে। ছোটবেলায় প্রায়ই একা থাকতে বেশি পছন্দ করতেন তিনি। কোনো কাজ করতে বললে প্রায়ই কান্না করতেন। বাড়ির পাশেই ছিল বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়াম। রিওডি জেনিরোর রোচা নামক বস্তি এলাকায় প্রায়ই কংক্রিটের মাঠে বড় ভাইদের ফুটবল খেলা দেখতেন বসে। ফুটবলকে পছন্দও করতেন, তবে কখনও খেলতেন না।
কুতিনহোর ফুটবল জাদুর প্রথম ঝলক জনসমক্ষে আসে ছয় বছর বয়সে। দাদির অনুরোধেই কুতিনহোকে ভর্তি করানো হয় স্থানীয় ফুটবল একাডেমিতে। প্রথমে তিনি কান্না করেছিলেন। কিন্তু সতীর্থদের অধিকাংশই পরিচিত থাকার কারণে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। ফুটবলের প্রতি ছোটবেলা থেকেই অনুরক্ত কুতিনহো এলাকায় একমাত্র তরুণ ডেডবল বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার বল পাস করার ক্ষমতা, মাঠের পার্শ্বদেশ থেকে বল নিয়ে ছোটা এবং তার সামগ্রিক বিচক্ষণতার কারণেই তাকে ‘দ্য লিটল ম্যাজিশিয়ান’ ডাকা হয়।
স্থানীয় একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রথমে তিনি নজরে পড়েন ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ক্লাব ভাস্কো দা গামার কোচের। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই ক্লাবে খেলেছেন। ২০০৮ সালে ইতালির ক্লাব ইন্টারমিলান ৪ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে কিনে নেয়। যদিও ধারে ভাস্কোতেই খেলেন তিনি। এ সময় ভাস্কোকে সিরি-এ বি শিরোপা অর্জনে সহায়তা করেন কুতিনহো। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মিলানের হয়ে খেলেন তিনি। এরপর ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের হয়ে খেলেছেন কুতিনহো। এ বছরের জানুয়ারিতে বার্সেলোনায় যোগ দেন কুতিনহো।
ব্রাজিলের হয়ে কুতিনহোর জন্য প্রথম সুযোগ আসে ২০০৫ সালে। এ বছর তিনি অনূর্ধ্ব-১৫ দলে ডাক পান। এরপর ২০০৯ সালে ব্রাজিল অনূর্ধ্ব-১৭, ২০১০ সালে জাতীয় দল, ২০১১ সালে ব্রাজিল অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সি গায়ে খেলেন কুতিনহো। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে কুতিনহোর ওপর তৎকালীন কোচ স্কলারি ভরসা না রাখলেও বিশ্বকাপের পর ভরসা রেখেছেন নতুন কোচ দুঙ্গা। দেশের হয়ে ৩৫ ম্যাচে করেছেন ৯ গোল।
ক্রিষ্টিয়ান ধর্মভক্ত কুতিনহো তার ফুটবল ক্যারিয়ারে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদিনহোকেই আইডল মানেন। ব্যক্তিজীবনে এক কন্যাসন্তানের জনক কুতিনহোর সব থেকে কাছের বন্ধু ব্রাজিলিয়ান ফুটবল তারকা নেইমার ও রবার্তো ফিরমিনো। রাশিয়া বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া কুতিনহো অবশ্যই চেষ্টা করবেন তার বন্ধুসম সতীর্থদের নিয়ে এবারের বিশ্বকাপের মঞ্চ রাঙাতে।

 

গোলের মাইলফলক ছুঁলেন নেইমার
ব্রাজিল তারকা নেইমার চোট থেকে তিন মাস পরে ফিরেছেন এতেই খুশি ভক্তরা। এরপর ক্রোয়েশিয়া বিপক্ষে তার গোলটি সমর্থকদের জন্য উপরি পাওয়া ছিল। কিন্তু নেইমার শুধু ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ফিরে এবং গোল করেই থামলেন না। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক গোল করলেন তিনি। আর ওই গোলে নেইমার ছুঁয়েছেন দারুণ এক মাইলফলক।

যৌথভাবে হয়ে গেছেন ব্রাজিলর তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা।
পিএসজি তারকা নেইমার ম্যাচের ৬৩ মিনিটের মাথায় উইলিয়ানদের দেওয়া পাস ধরে দারুন দক্ষতায় পরাস্ত করেন দুই ডিফেন্ডারকে। এরপর বুদ্ধিদীপ্ত এক শটে লক্ষ্য ভেদ করেন তিনি। ওই গোলে নেইমার ব্রাজিলের হয়ে ৫৫ গোল করেছেন। ছুঁয়েছেন ব্রাজিলর বিশ্বকাপ জয়ী রোমারিও গোলের রেকর্ড। আর মাত্র একটি গোল করতে পারলেই রোমারিওকে চারে ঠেলে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন নেইমার।
এছাড়া নেইমার ব্রাজিলের আরেক বিশ্বকাপ জয়ী স্টাইকার রোনালদোর থেকেও খুব বেশি দূরে নেই। রোনালদোর গোল সংখ্যা ৬২টি। নেইমার আর মাত্র ৭ গোল করলেই ছুঁয়ে ফেলবেন রোনালদোকে। এছাড়া ২৬ বছর বয়সী নেইমারের চোখ ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ গোল করা পেলের দিকে। ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের গোল সংখ্যা ৭৭টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *