জেলে দেখা করে হোটেলে বসে হত্যার পরিকল্পনা

বিশেষ প্রতিনিধি : মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল জেলে থাকা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে আসার পর। দুটি হোটেলে বসে। খুনিদের একাংশ একটি হোটেলে বসে এই হত্যাকাণ্ডের ছক
আঁকে। জেলখানায় অন্যদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল গ্রেপ্তার হওয়া নুর উদ্দিনও। হত্যাকাণ্ডের পর কে কীভাবে পালিয়ে যাবে কার কী দায়িত্ব সব কিছুই ঠিক করা হয়েছিল হোটেলে বসেই।

সাত আসামিকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে এসব তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ বুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

যেদিন হয়েছিল হত্যার পরিকল্পনা
অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে চলতি মাসের ৪ এপ্রিল কারাগারে দেখা করতে যান নুর উদ্দিনসহ বেশ কয়েক জন। সেদিন জেল থেকে সাক্ষাত শেষে বেরিয়ে তারা একটি হোটেলে বসে প্রাথমিক আলোচনা করেন। পর দিন অর্থাৎ ৫ এপ্রিল আবারও একটি হোটেলে একত্রিত হন খুনিরা। মূলত সেই দিনই হত্যার চূড়ান্ত ছক তৈরি করা হয়।

পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারসহ মামলার তদন্তে থাকা একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন। বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘আসামিদের একাংশ ৫ এপ্রিল হোটেলে বসে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলে যে, নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে। নুসরাতকে আগুনে পোড়ানোর দুটি কারণ স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা।’

হত্যার সময় খুনিদের কার কী দায়িত্ব ছিল
গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের দেয়া তথ্যমতে এবং মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে খুনিরা কে, কীভাবে হত্যায় অংশ নেবে। মূলত চারজনের দায়িত্ব ছিল ছাদে নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া। দুই জনের দায়িত্ব ছিল ওই ভবনের সিঁড়ি ঘরের সামনে অবস্থান নিয়ে অন্যদের পরিস্থিতির আপডেট জানানো। আর দুই জনের দায়িত্ব ছিল ছাদের ওপরে থেকে আগুন লাগিয়ে দেয়া এবং চার জনকে নিরাপদে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিরাপদে বের করার ব্যবস্থা করা। এদের মধ্যে হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ তিনজনের দায়িত্ব ছিল সার্বক্ষনিক গেট পাহাড়া দেয়া। দুই মেয়ের দায়িত্ব ছিল বোরকা ও কেরোসিন সংগ্রহ করা। এছাড়াও অন্যরা সামগ্রিক পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য প্রস্তুত ছিল।

বোরকা পরে টয়লেটে লুকিয়ে ছিল দুই খুনি
নুসরাতকে যে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন দেয়া হয় সেই ভবনের ছাদে দুটি টয়লেট ছিল। আর ওই দুই টয়লেটে দুজন খুনি আগে থেকেই বোরকা পরে বসে ছিল। নুসরাতকে যখন ছাদে ডেকে আনা হয়, তখন বাথরুম থেকে ওই দুজন খুনি বেরিয়ে এসে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

তবে একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে কীভাবে বোরকা পরা দুজন ব্যক্তি প্রবেশ করে ছাদে লুকিয়ে ছিল এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘খুনিরা কীভাবে সেখানে প্রবেশ করে লুকিয়ে ছিল সেটা লোকাল প্রশাসনের জানার কথা। তবে এই বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে যে একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে তারা কীভাবে প্রবেশ করে ছাদের টয়লেটে লুকিয়ে ছিল।’

গায়ে আগুন দিয়ে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে যায় খুনিরা
পিবিআই তদন্তে সূত্রে জানা যায়, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী খুনিরা ছাদের ওপরে নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়ে দ্রুত নিচে নামেন। এ সময় নুসরাতের চিৎকারে যখন শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ জড়ো হতে থাকে। তখন খুনিরা মানুষের ভিড়ে মিশে যায়। তারাও অন্যদের মতো চিৎকার করে দগ্ধ নুসরাতকে বাঁচাতে সহযোগিতার অভিনয় করতে থাকেন।

গায়ে আগুন নিয়ে কেন সিঁড়ি দিয়ে নিচে দৌড় দিয়েছিল নুসরাত
নুসরাতকে যখন গায়ে আগুন দেয়া হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই দিক-বেদিক হারিয়ে ছাদের ওপর থেকে নুসরাতের নিচে পড়ে যাবার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু নুসরাত কেন গায়ে আগুন নিয়েই দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেছিলেন তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলে ছিলেন।

এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘নুসরাতকে যে ভবনের ছাদে আগুন দেয়া হয়েছিল সেটি ছিল মূলত একটি সাইক্লোন সেন্টার। তাই এই সাইক্লোন সেন্টারের ছাদটি ছিল বেশ সুরক্ষিত। ঘটনার পরে আমাদের পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছিল। তারা দেখেছেন ভবনের ছাদটি চারদিকে থেকে প্রায় ১০ ফিটের মতো উঁচু দেয়াল দেয়া। সে কারণে স্বাভাবিক কোনো মানুষই ওই দেয়াল টপকে নিচে লাফ দিতে পারবে না। ছাদ থেকে নিচে নামার জন্য একটি মাত্র সিঁড়িই হচ্ছে নামার উপায়। এই কারণে নুসরাত গায়ে আগুন নিয়েই ওই সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমেছিল।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *