তেঁতুলিয়া নদীর বুকে সূর্যাস্ত

 

মো. জাভেদ হাকিম : তিন কন্যার জনক বলে কথা! আমার মতো তারাও হয়েছে ভ্রমণপিয়াসি? তিনজনের মতামতের গুরুত্ব দিতে গিয়ে প্রায়ই আমাকে ছুটতে হয় নতুন কোনো স্থানে, এবার মেজো মেয়ে রবিতার কথা রাখতে গিয়ে ছুটে ছিলাম পটুয়াখালী জেলার গ্রাম বাংলার অপরুপ সৌন্দর্যের উপজেলা দশমিনা ও তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতসিনী তেতুলিয়া নদীর মায়াবি রূপ দেখতে ও দেখাতে।
সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে সদরঘাট নৌ-টার্মিনাল হতে সাত্তার খান নামক জাহাজ পটুয়াখালির উদ্দেশে হইসেল বাজিয়ে ঘাট ত্যাগ করে। জাহাজের কর্মকর্তা সোহেলের বদৌলতে ভিআইপি কেবিন পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। সাজানো গুছানো ক্যাবিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেয়েরা দেখেছে নদী ও নদীর পারের সৌন্দর্য। সদরঘাটে যখন জাহাজ ভিড়ে ছিল তখন আমার প্রাণের নদী বুড়িগঙ্গার দূষিত পানির দুর্গন্ধে শিশুদের অবস্থা হয়ে পড়েছিল ত্রাহি ত্রাহি। সেই সঙ্গে বড় মেয়ে কনিতার প্রশ্ন- আব্বু তুমি এত নোংড়া পানিতে কিভাবে গোসল করতে, সাতার কাটতে? এই জন্যই দাদু তোমাকে শিকল দিয়ে বেধে রাখত। মেয়ের কথায় কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম সেই শৈশবের স্মৃতির আঙিনায়।


তিন কন্যা জাহাজে হেঁটে বেড়ায় আর নানান প্রশ্নবানে আমাকে জর্জরিত করে। আমি সাধ্য অনুযায়ী তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। এক সময় জাহাজ শীতলক্ষ্যার জলে ভাসে। নির্মল বাতাসে মুগ্ধ হই, সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও আমি জেগে রই। রাত বারটায় উত্তাল মেঘনা পাড়ের চাঁদপুর ঘাটে জাহাজ ভিড়ে। তাজা ইলিশের গন্ধ পাই। আবারও জাহাজ ছুটে পটুয়াখালির উদ্দেশে। আমিও কেবিনে ঠুকে ঘুমের দেশে পাড়ি জমাই। ভোর চারটায় কেবিন বয়ের ডাকে ঘুম ভাঙে- তাড়াতাড়ি উঠেন বগা আইয়া পড়ছে।দ্রুত সবাই প্রস্তুত হই। রাত তখন চারটা বিশ। পল্টুনে নেমে পরি। আগে থেকেই মাইক্রো রেডি ছিল। হিম হিম ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে দু-পাশের বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত পিছনে ফেলে গাড়ি ছুটছে দশমিনার প্রান্তরে। এবড়ো থেবড়ো রাস্তা পার হয়ে ঘন্টা খানেকের পৌঁছে যাই দশমিনা উপজেলা হাসপাতাল কমপ্লেক্সের কোয়াটারে। কোয়ার্টারের বাসিন্দা ভগ্নিপতি ডাক্তার আওলাদ হোসেন। বহুদিন পর ভাই ভাবি ভাতিজিদের পেলে যা করে তার চেয়ে খানিকটা যেন একটু বেশিই করলো বোন মাহবুবা। আর ভগ্নিপতির উচ্ছ¡াস বন্দিপাখি মুক্ত বিহঙ্গে ছেড়ে দেওয়ার চাইতেও এক ধাপ বেশি। যে সব মাছ পছন্দ করি তা লোকজন দিয়ে বিল থেকে ধরিয়ে এনে রেখেছেন। পুরাতন কুচ কুচে কালো হয়ে যাওয়া কৈ, পাবদা আর বোয়াল, চিংড়ী আরো কত কি মাছ। দুইদিন থেকে একটু আধটু করে সব খাবারেরই স্বাদ নিয়েছি।


দুপুরের খাবার খেয়ে চলে যাই ঐতিহ্যবাহী কবিরাজ বাড়ী। পুরনো গাছগুলো কেটে ফেলার কারণে এখন যেন অনেকটাই শ্রী-হীন। তবে শান বাধানো দীঘির সৌন্দর্য এখনো অমলিন। ঘাটে বসলে পাকা ধানের মৌ মৌ ঘ্রানে এক অন্যরকম আবেশে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবেন আর শিশুরা জানতে ও শিখতে পারবে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত অনেক কিছু সম্পর্কে। ধান গাছ দিয়ে কি কাঠ হয় এই অবান্তর প্রশ্নটুকু অন্তত শিশুরা করবে না।


পর দিন সকালে বাশবাড়ীয়া উপজেলার স্বপ্নচূড়া পার্কে যাই। চলার পথের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা বড়ই কঠিন। নৈসর্গমন্ডিত হরেক প্রকারের ফুল বাগান সমৃদ্ধ পার্কে শিশুদের নিয়ে বেশ কিছু সময় হৈ চৈ আর সুইমিং করে বিকালে চলে যাই দশামিনা হাজির হাট তেতুলিয়া নদীর ধারে। তেতুলিয়া নদী প্রকৃতির এক অনন্য নিদর্শন। এই নদীর আকাশটা যেন পুরোটাই অন্যরকম। স¦চক্ষে দেখা ছাড়া লিখে বুঝানো সম্ভব নয়! শরীরে আলিঙ্গন করে যাবে শিষা মুক্ত বাতাসের ছোঁয়া। সব মৌসুমেই থৈ থৈ জলের তেঁতুলিয়া নদীতে  নিয়মিত জোয়ার ভাটা হয়। মেঘনা নদী হতে তেঁতুলিয়া নদী উৎপত্তি হয়ে বাউফলের পাশ দিয়ে নাজিরপুর গ্রাম, কালাইয়া বন্দর দশমিনা চড় কাজল হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। মাছের রাজা ইলিশের জন্যও রয়েছে এই নদীর বিশেষ খ্যাতি। পড়ন্ত বিকালে শিশুদের নৌভ্রমণের শখ জাগে। ওমনি ঘাট থেকে ট্রলার নিয়ে নদীর বুকে ভাসি। চলে যাই দশমিনা উপজেলা বীজ-উৎপাদন খামার। খামারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা কিবরিয়া সাহেব আমাদের অভ্যর্থনা ও কচি ডাবের পানি পান করালেন। তেঁতুলিয়া নদীর বুকে জেগে উঠা প্রায় এক হাজার চৌয়াল্লিশ একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে রবী শষ্যের এই বিজ বর্ধন খামার। রাজধানীর ফ্ল্যাটে বন্দি থাকা শিশুরা, খোলা প্রান্তরের সবুজ বেষ্টনির মাঝে মন খুলে হাসে-খেলে। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দেশি বালাম চালের ধান ক্ষেতে বাতাসের দোল, দৃষ্টির সিমানা যত দূর যায় শুধু শস্যক্ষেত আর সবুজের সমারোহ। সে এক অন্যরকম অনুভ‚তির শিহরণ। দিন শেষে সূর্যী মামার শুরু হয় বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি। বিভিন্ন রঙ, আকার, ভঙ্গিমা আর আলোর বিকিরণে দিনভর আগুয়ান রশ্মি ছড়ানো সূর্ষটা গোলাপি রূপ ধারন করে তেঁতুলিয়া নদীর টইটুম্বুর জলে টুপ করে ডুব দেয়। তেজোদীপ্ত সূর্য বিদায়ের শেষ দৃশ্য ছিল বড় অদ্ভুদ সৌন্দর্যের। আকাশ ঢেকে দেওয়া ক্ষয়িষ্ণু সূর্ষের লাল আভা আর পানির রঙ মিলেমিশে একাকার। সেই অসাধারণ ভালো লাগা দৃশ্যের মনো মুগ্ধকর মুহূর্তটুকু স্বপরিবারে উপভোগ করার আনন্দই ভিন্ন রকম। স্মৃতির আঙিনায় বহুকাল উজ্জল হয়ে থাকবে তেঁতুলিয়া নদীর বুকে এক অন্যরকম নয়নাভিরাম সূর্যাস্তের।

যোগাযোগ: সদরঘাট থেকে সরাসরি এমভি জাহিদ ও আচল লঞ্চ এবং সায়েদাবাদ থেকে বি আরটিসি বাস সার্ভিস চলাচল করে দশমিনা পর্যন্ত। স্বাচ্ছন্দে যেতে চাইলে পটুয়াখালিগামী জাহাজে বগা পর্যন্ত গিয়ে গাড়ি/অটোতে যেতে হবে। এর জন্য ভ্রমণের খরচে গুনতে হবে বাড়তি প্রায় দু-হাজার টাকা। থাকার জন্য উপজেলা ডাক-বাংলো সহ বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে।

* ঢাকার সদরঘাট টার্মিনাল হতে পটুয়াখালির রাঙ্গাবালি পর্যন্ত জাহাজ চলাচল করে, দশমিনা যেতে হলে নামতে হবে হাজির হাট আর সময় বাঁচাতে চাইলে বাঁশবাড়িয়া নৌ-ঘোট। ভাড়া সিঙ্গেল কেবিন ১,০০০/=, ডাবল ১,৮০০/= এবং ডেকের যাত্রীদের ভাড়া প্রতিজন ৩০০/= টাকা মাত্র।

 আর টিকেট যাত্রার দিন বেলা ২টা থেকে ৩টার মধ্যে নিলেই হবে।

 জাহাজ ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টায়।

 দশমিনায় থাকা-খাওয়ার জন্য মধ্যম মানের আবাসিক বোর্ডিং ও রেস্টুরেন্ট আছে। ডাকবাংলোতে রাত কাটাতে চাইলে জেলা পরিষদ হতে পূর্ব অনুমতি নিতে হবে।

 নদীর টাট্কা মাছ নিয়ে আসতে চাইলে কিংবা রান্না করে খেতে চাইলে যোগাযোগ করুন:  সৈয়দ হোসেন-০১৭৯৮-০৫৫১৩৩

ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

Check Also

প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে নালিশ করা প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে …

মেয়ে ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত মা

অনলাইন ডেস্ক : রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় বিদ্যালয়ের সামনে তিনজন বোরকা পরা নারীকে সন্দেহজনক অবস্থায় ঘোরাঘুরি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *