Dulal Hasan

দুলাল হাসানের উপন্যাস- বন্ধুবিলাস (পর্ব-৭)

কাজকর্ম স্বাভাবিক হয়ে এসেছে চৌধুরীর। দুঃস্বপ্ন দেখার পর থেকে কিছুদিন বিমর্ষ ছিলেন। কোথাও তেমন একটা যাননি। গ্রামের লোকজন নানা বিষয় নিয়ে তার কাছে আসে। তিনি তাদের সঙ্গে ঠিকমতো দেখা করেন না। প্রাণ খুলে কথা বলেন না। আগের মতো সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়ান না। এ নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যেও কানাঘুষা। এরই মধ্যে গ্রামে রটে গেছে চৌধুরী আবার বিয়ে করছেন। সকাল বিকাল ঘটক তার পেছনে ঘুরঘুর করে। তিনিও ঘটকের সঙ্গে গুজুর গুজুর ফুসুরফুসুর করেন। বুড়া বয়সে ভিমরতিতে ধরেছে তাকে। এ কারণে গ্রামের লোকদের সময় দিতে চান না। কিন্তু না, সবকিছু কাটিয়ে উঠেছেন চৌধুরী। গতকাল পর্যন্ত দুঃস্বপ্নটা তাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে। আজ মনটা বেশ ফুরফুরে। গতকাল তিনি গ্রামের মানুষদের দাওয়াত দিয়ে মেজবানী খাইয়েছেন। গরু জবাই করে খাইয়েছেন।
গ্রামের মানুষের মধ্যে একটা হাহাকার শুরু হয়েছিল। কি যেন নেই, কি যেন নেই। তাদের মনে সুখ ছিল না। মেজবানী অনুষ্ঠানে তিনি গ্রামের মানুষের কাছে এ জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। আজ শরীরটা খুব হালকা লাগছে। যেন যৌবন ফিরে এসেছে।
খেজুরের রস বিক্রেতাকে ডেকে এনেছে কাসু। বাড়ির উঠানে বসে রস খাচ্ছেন চৌধুরী। আর কাসুকে বলছেন বাজার থেকে কিছু সদাই কিনে আনতে। কি আনতে খুব মনোযোগ সহকারে শুনছে কাসু। এমনিতে সে কানে কম শোনে। তার ওপর ভুলো মন। চৌধুরী বলছেন- তাড়াতাড়ি আসবি।
যামু আর আমু। কাসু বলে।
আবার ভুলে যাইস না।
কাসু চলে যাচ্ছিল। চৌধুরী কথা শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে- জ্বে, আর কিছু…
না, আর কিছু না। মনে করতে করতে যা। আজ যদি ভুল হয় তবে বুঝিস বাড়িতে তোর জায়গা নেই।
ইট্টুও ভুল হইবো না। কাসু খুশিতে গদগদ। হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটে। আর মুখে বলে- এক প্যাকেট সিগারেট, এক কেজি চিনি, দুই হালি ডিম, চাইরটা মুরগি।
পথে হরমুজের সঙ্গে দেখা। হরমুজ তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে-চৌধুরী সাহেব বাড়ি আছেন কাসু?
কাসু হরমুজের কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারে কিনা বোঝা যায় না। সে বলে- জ্বে, বাজারে যাই।
হরমুজ ভুলে গিয়েছিল কাসু কানে কম শোনে। নিজের সঙ্গে কথা বলে সে- ওহ্ তোর তো আবার ব্যাটারিতে চার্জ কম।
এরপর কাসুর কানের কাছে গিয়ে জোরে বলে- জানতে চাইছি চৌধুরী সাব বাড়িত আছেন কিনা?
কাসু বিরক্ত। মহাবিরক্ত। হরমুজকে তিরস্কারের ছলে বলে- এতো চিল্লাইয়া কথা কও ক্যান? আমি কি কানে কম শুনি?
অভিমান করে অন্যদিকে চলে যেতে চায় কাসু। হরমুজ তাকে আটকায়। বলে-
না না তা হইবো ক্যান। আমিই আস্তে কথা কইতে পারি না। এইবার কও তো বাছাধন- চৌধুরী সাব বাড়িত আছেন?
হ আছে।
হরমুজ আশ্বস্ত হয়। মনে মনে বেজায় খুশি। হাসতে হাসতে চৌধুরীর বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে।
হরমুজ কিছুদূর চলে গেলে কাসু চিন্তা করে। নিজে নিজে বলে- কয়দিন ধইরা দেখতাছি ঘটক ঘন ঘন চৌধুরী সাবের কাছে আইতাছে। তাইলে কি ঘটনা প্যাঁচ খাইয়া গেল? চৌধুরী সাব কি সত্যি সত্যি আবার বিয়া করবো। কি জানি! করতেও পারে। বড়লোকের কত রকম শখ থাকে। যাউ¹া, হেইডা পরে ভাবন যাইবো। এহন সদাই নিয়া আসি।
এরপর হাঁটতে শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে থামে। কি আনতে বলেছেন চৌধুরী মনে করতে পারছে সে। বারবার আওড়ায়। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ে না। নিজের ওপর বিরক্ত হয় আর বলেÑ
ইস্ ঘটক ব্যাটা চিল্লানি দিয়া সব গোলমাল কইরা দিছে। কি জানি আনতে কইছে… আনতে কইছে… হ হ মনে পড়ছে- এক প্যাকেট মুরগি, এক কেজি সিগারেট, চাইরটা চিনি, দুইহালি তেল।
এরপর গ্রামের দু’ চারজনের সঙ্গে দেখা হয় কাসুর। তাদের কাছ থেকে সদাইয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চায়। চৌধুরীর বাড়িতে দীর্ঘদিন থাকার কারণে গ্রামের প্রায় লোকই তাকে চেনে। তারা তার সঙ্গে হাস্যরসের কথা কয়। টিপ্পনি কাটে। একটা গোলকধাঁধায় পড়ে যায় কাসু। সে বাজারে যাবে নাকি বাড়ি ফিরে গিয়ে আবার সব জেনে আসবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। পাটীগণিতের বানরের মতো একবার বাজারের দিকে দু’ পা আগায় তো বাড়ির দিকে তিন পা পিছায়।

চৌধুরী সাহেব জমিজমার দলিলের মধ্যে ডুবে আছেন। পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি কতটুকু আর তিনি কতটুকু কিনেছেন হিসাব মেলাতে পারছেন না। বারবার গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এই প্রথম মনে হলো তার বয়স হয়েছে। সবকিছু সামলে রাখার ক্ষমতা ক্রমশ লোপ পাচ্ছে। এই মুহূর্তে এক কাপ বাষ্প উঠা চা আর একটা সিগারেট খুব প্রয়োজন। ঘরে চিনি নেই। সিগারেট শেষ হয়ে গেছে সকালে। কাসু এখনও আসছে না। তাকে এগুলো আনতে পাঠানো হয়েছে। মর্জিনাকে ডেকেও আবার কি মনে করে বললেন- না থাক আসতে হবে না।
বাইরে থেকে কে যেন ডাকছে। চৌধুরী সাব শব্দটি তার কানে ভেসে আসছে। লোকটি প্রথমে ডেকেছে নিম্নস্বরে। এখন গলা একটু খুলেছে। তবে তা-ও খুব সতর্কতার সঙ্গে। যেন কোনভাবে চৌধুরী বিরক্ত বা রাগ না করেন।
আশিককে ডাকলেন চৌধুরী সাহেব। একবার দু’ বার তিনবার। সাড়া শব্দ নেই। মর্জিনা এসে জানালো আশিক ভাইয়া বাড়ি নাই। সকালে বাইর হইয়া গেছেন।
চৌধুরী বললেন- দেখ তো কে এসেছে।
মর্জিনা বাইরে এসে দেখলো- একটি লোক।
মর্জিনাকে দেখে লোকটি বত্রিশ পাটি বের জানতে চাইলো- চৌধুরী সাব বাড়ি আছেন?
আপনি কে? নাম কন।
হরমুজ। আমার নাম হরমুজ। চৌধুরী সাব আমারে চিনেন।
উনি ব্যস্ত। পরে আসেন।
খুব জরুরি দরকার। তুমি আমার নাম বলো।
কইলাম তো উনি জরুরি খাতাপত্র লইয়া বইছে। এহন দেহা অইবো না। কাইল আসেন।
আমারে চৌধুরী সাব আসতে বলছেন। তুমি শুধু উনাকে বলো- হরমুজ ভাই আইছে।
মর্জিনা কিছুটা বিরক্ত। লোকটি তো খুব বেহাইয়া। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলে- ঠিক আছে খাড়ান দেহি।
এর আগেও দু’ একবার লোকটিকে এ বাড়িতে দেখেছে মর্জিনা। চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে খুব হেসে হেসে ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলতে দেখেছে। তবে যাইহোক লোকটির দাঁতগুলো খুব সুন্দর। টিভিতে টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনে খুব মানাতো তাকে। বিজ্ঞাপনদাতারা বাচ্চাদের দিয়ে বিজ্ঞাপন তৈরি করে। আরে ভাই- বাচ্চাদের নতুন ওঠা দাঁতে কি সমস্যা থাকে? যত সমস্যা বয়স্কদের দাঁতে। এ লোকটিকে দিয়ে বিজ্ঞাপন বানালে মানাতো বেশ।

তখনও দলিলপত্রে ডুবে আছেন চৌধুরী। মর্জিনা গিয়ে বলে- তরমুজ ভাই আইছে।
দলিল থেকে মাথা না তুলে চৌধুরী বলেন- বলে দে পরে আসতে। আমি এখন ব্যস্ত আছি।
কইছিলাম, হোনে না। বেহায়া লোকটা কয় আপনি নাকি তারে আসতে কইছেন। খুব দরকার।
কি নাম বললি?
তরমুজ।
তরমুজ! এটা আবার কে? চৌধুরী মনে করার চেষ্টা করেন। এ নামের কারও সঙ্গে পরিচয় আছে বলে মনে করতে পারেন না তিনি। শেষে বলেন- আচ্ছা আসতে বল।
মর্জিনা লোকটিকে ডেকে আনে। তাকে দেখে চৌধুরী হাসতে হাসতে বলে- আরে হরমুজ মিয়া যে। আসো আসো। দেখ দেখি কাণ্ড মর্জিনা এসে বলে- তরমুজ। হা হা হা চৌধুরী হাসতে থাকেন। সঙ্গে তাল মেলায় হরমুজ।
হাসি থামিয়ে চৌধুরী বলেন- বসো বসো। কাগজপত্র সরিয়ে রেখে বলেন- তারপর বলো কি খবর।
খান সাবকে তো আপনি চিনেন চৌধুরী সাব।
চিনি মানে! কেমন কথা কও তুমি। কইলাম না সে আমার বাল্যবন্ধু। আমরা একসঙ্গে লেখাপড়া করেছি। বড় হয়েছি। বাবার মৃত্যুর পর সংসারে দায়িত্ব কাঁধে চাপে। নানা কারণে ওর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। খানেরও ওই একই কারণে আমার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়নি।
তাইলে তো আর কোন সমস্যাই থাকলো না। এহন কবে যাইবেন কন?
কই যামু?
বিয়ার প্রস্তাব লইয়া খান সাবের বাড়িতে যাইতে হইবো না?
আমি ক্যান যামু? আমি ছেলের বাপ। মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইলে খানকেই আমার বাড়িতে আসতে হবে।
চৌধুরী সাব, বেয়াদবি না নিলে আমি একটা কথা কই।
কি বলতে চাও।
চৌধুরী সাব, আমাদের দেশে সাধারণত ছেলের পক্ষ থেকেই প্রস্তাব যায় মেয়ের বাড়ি।
না না আমি কেন খানের কাছে ছোট হতে যাবো।
এখানে ছোট-বড়’র ব্যাপার না চৌধুরী সাব। আমাদের দেশে এটাই নিয়ম। তাছাড়া আপনারা দু’জন বাল্যবন্ধু। বন্ধুর বাড়িতে বন্ধু এমনিতেই যাইতে পারে। যুগ অনেক বদলাইছে এই কথা না হয় না-ই কইলাম।
তোমার কথায় যুক্তি আছে। ঠিক আছে, তুমি যখন এত কইরা কইতাছ।
আলহামদুলিল্লাহ। আমি তাইলে খান সাবেরে খবরডা দেই গিয়া। হে হে হে…
খান সাহেবের বাড়িতে উৎসব। এত বছর পর বাল্যবন্ধু চৌধুরী তার বাড়িতে আসবেন এই খুশি তিনি ধরে রাখতে পারছেন না। তা-ও আবার এমনি এমনি আসছেন না। বিয়ের পয়গাম নিয়ে আসছেন। তিনি কি করবেন! কি করলে বন্ধুকে সঠিক সম্মান করা হবে এ নিয়ে মহাব্যস্ত। সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও তার মনে হচ্ছে এটা ঠিক হয়নি। কোথাও একটা খুঁত রয়ে গেছে। এটাকে কিভাবে আরও নিখুঁত করা যায় সেজন্য লালুকে ধমকাচ্ছেন- এই কাজটা করেছিস? ওইটা কি ঠিকমতো হইছে?
খান সাহেবকে আশ্বস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে লালু। তারপরও তিনি সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। বন্ধু কি খেতে পছন্দ করে মনে করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এত বছর পর সবকিছু ঝাপসা হয়ে এসেছে। ঠিক মনে করতে পারছেন না।
খান সাহেবের প্রচুর ধন-সম্পত্তি থাকার পরও কোনদিন মোবাইল ফোন কেনার প্রয়োজন মনে করেননি। যখন শোনলেন চৌধুরী আসছেন তখন তিনি একটি নতুন মোবাইল ফোন কিনেছেন। বারবার তিনি ওটির বোতাম টিপছেন। চৌধুরীর লাইন পাচ্ছেন না। যতবার কানে ধরছেন ততবার শুনতে পাচ্ছেন- এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দয়া করে একটু পরে আবার চেষ্টা করুন।
চেষ্টার ত্র“টি করছেন না খান সাহেব। বারবার চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হচ্ছেন তখন বিরক্ত হয়ে লালুকে বললেন- কি ফোন এইটা লালু, বারবার একই কথা বলে। ধর তুই চেষ্টা কর তো।
লালু যখন ব্যর্থ তখন খান সাহেব কিছুটা উতলা হয়ে উঠলেন। একবার বাইরে এসে পথের দিকে তাকাচ্ছেন চৌধুরী আসছে কিনা দেখার জন্য। আবার বাড়ির ভেতরে যাচ্ছেন তদারক করার জন্য সব ঠিক আছে কিনা। তার পিছু পিছু চড়কির মতো ঘুরছে লালু।
লালুর কাছে আবারও জানতে চান খান- সবকিছু ঠিকমতো করছস তো?
কথা বলার সময় লালুর ইংরেজি বলার বাতিক আছে এটা আমরা সবাই জানি। জোর দিয়ে মাথা নেড়ে সে বলে- করছি মানে? হানডেরেড পারসেন। আপনে উতলা হইবেন না। মাথা কুল কইরা ইট্টু সিট ডাউন করেন। সব ঠিক আছে ইনশাল্লাহ।

Check Also

Novel bondhubilash

দুলাল হাসানের উপন্যাস- বন্ধুবিলাস (পর্ব-৬)

রোদের তীব্রতা ক্রমশ বাড়ছে। তবে বাতাস বইছে বিধায় তেমন গরম লাগছে না। চাষী বধূরা এক …

Dulal Hasan

দুলাল হাসানের উপন্যাস- বন্ধুবিলাস (পর্ব-৫)

ঘুম ভেঙে যায় চৌধুরীর। বিছানায় উঠে বসেন। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। গলা শুকিয়ে কাঠ। পুরো …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *