পাঁচ কারণে বিশ্বকাপ জিততে পারে আর্জেন্টিনা

স্পোর্টস ডেস্ক : আর্জেন্টিনা দল রোববার (১০ জুন) মাঝরাতে রাশিয়ায় পা দিয়েছে। তাদের শুভেচ্ছা জানাতে এবং মেসিকে দেখতে ওই মাঝরাতেই ভিড় জমিয়েছে অনেক সমর্থক। মেসিরা হয়তো এতে অবাক হননি। কারণ আগামী এক মাস হয়তো রাশিয়া আর ঘুমাবে না। ঝকঝকে আলোয় আর ফুটবল উন্মাদনায় জেগে থাকবে ২৪ ঘন্টা। আর্জেন্টিনা দল এবং মেসি কড়া নিরাপত্তায় বিমান ছেড়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। হাত নাড়িয়ে ভক্তদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন মেসি।
নিশ্চয়ই এই শুভেচ্ছা, ভালোবাসা এবং উচ্ছ্বাস নিয়ে দেশে ফিরতে মেসিরা। কারণ রাশিয়া বিশ্বকাপে হেরে বাড়ি ফেরার সময় নিশ্চয় সমর্থকরা বিদায় জানাতে আসবে না। যা ক’জন আসবে তাদের শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়ে মুচকি হেসে বিদায় নিতে পারবেন না বার্সেলোনা তারকা। তাই তাদের জিততে হবে বিশ্বকাপের শিরোপা। আর মেসিদের রাশিয়া থেকে শিরোপা জিতে ফেরার পেছনে থাকবেন মেসি, তাদের কোচ এবং আক্রমণভাগ। আর্জেন্টিনার এবার রাশিয়া বিশ্বকাপ জয়ের পাঁচ কারণ উল্লেখ করা হলো:

শক্ত আক্রমণভাগ: সম্ভবত আর্জেন্টিনার নিন্দুকেরাও অস্বীকার করতে পারবে না। মেসি-আগুয়েরো-ডি মারিয়া সঙ্গে হিগুয়েইন, দিবালা-পাভনদের নিয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগ আর্জেন্টিনার। সতন্ত্র অনেক নামী ফুটবলার নিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে। ব্রাজিল, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম কিংবা জার্মানির দারুণ শক্তিশালী দল আছে। কিন্তু যদি কোন দেশের আক্রমণের সঙ্গে অন্য দেশের আক্রমণের তুলনা করা হয়। তবে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং তারকা খ্যাতিতে এগিয়ে থাকবে আর্জেন্টিনা।
লিগের ২০১৭-১৮ মৌসুমে আর্জেন্টাইন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের গোল অনেকের ঈর্ষার কারণ হবে। অবাক হবেন অনেকেই। মেসি এবারের ইউরোপের সেরা লিগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৪ গোল করেছেন। আগুয়েরো ইংলিশ লিগে গোল করেছেন ৩০টি। হিগুয়েইনের গোল সংখ্যা ২৩। অন্য জুভেন্টান তারকা পাওলো দিবালা করেছেন ২৪ গোল। ডি মারিয়া জালে ১৯ বার বল পাঠিয়েছেন। শক্ত এই আক্রমণভাগ নিয়ে বিশেষ করে যারা গোল করতে পারে তাদের নিয়ে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন আর্জেন্টিনা দেখতেই পারে।

মেসির প্রভাব: মেসি বিশ্ব ফুটবলের নেতা। আর্জেন্টিনারও। বিশ্বের যে কোন দলে একজন মেসির মতো বিশ্বসেরা ফুটবলার থাকলেই তারা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখবে। সেখানে মেসিদের আছে দারুণ কোচ, শক্ত আক্রমণভাগ। সঙ্গে মেসিদের সহায়তা করার মতো মাঝমাঠ। মেসি এমন এক ফুটবলার যিনি প্রতিভাবানের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। ফুটবল জাদুকরের আলাদা বর্ণনা লিখতে বাধ্য করেছেন। মেসির দাপটেই ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। ২০১৮ সালে তিনি আরো পরিণত। যা আর্জেন্টিনাকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।

বিশ্বকাপে দারুণ ইতিহাস: সুইজারল্যান্ডের দারুণ এক দল আছে। ফিফা র্যাংরকিংয়ে তারা ছয়ে অবস্থান করছে। দুর্দান্ত এক দল আছে বেলজিয়ামেরও। ইংল্যান্ডকে বাদ দেওয়ার উপায় নেই। পর্তুগালে আছেন রোনালদো। কিন্তু তাদের বিশ্বকাপ জয় নিয়ে অত কথা হচ্ছে না। কারণ ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস তাদের পক্ষে কথা বলে না। কিন্তু আর্জেন্টিনা সেখানে ব্যাতিক্রম। দুইবার বিশ্বকাপ জয়, সঙ্গে তিনবার রানার্স আপ তাদের পিঠে বিশ্বকাপের দাবিদার কথাটা শেটে দেয়।

কোচ হোর্হে সাম্পাওলির প্রভাব: আর্জেন্টিনাকে খাদের কিনার থেকে সরাসরি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিয়ে গেছেন তিনি। চিলির প্রধান কোচ হিসেবে বেশ সাফল্য আছে তার ঝুলিতে। স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়ার ভালো করেছেন এই আর্জেন্টাইন। আর এসবের কারণে আর্জেন্টিনা দলের উপর নিয়ন্ত্রন আছে কোচ সাম্পাওলির। স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারেন। এমনকি আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে ব্যর্থ হলেও তাকে বরখাস্ত করা হবে না। এমন অভয়ও পেয়েছেন ২০১৭’র জুনে দায়িত্ব নেওয়া এই কোচ। আর কৌশলের দিকে থেকে বর্তমান বিশ্বের সেরা কোচদের একজন সাম্পাওলি। এটা তিনি কোপা আমেরিকায় এবং ইউরোপের ক্লাবে প্রমাণ করেছেন।

ফেবারিট তকমা না পাওয়া: ফেবারিট তকমা যে আর্জেন্টিনা একেবারে পায়নি তা নয়। কিন্তু আর্জেন্টিনা ফেবারিটের তকমাটা গায়ে মাখেনি। মেসিতো বারং বার বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বকাপের সেরা দল না। তবে বিশ্বকাপ জয়ের ভালো সুযোগ আছে আমাদের।’ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভালো ফুটবল খেলতে না পারা। মেসি নির্ভরতা। দলের খেলোয়াড়দের ইনজুরি। এসব কারণে অনেকে আর্জেন্টিনাকে ফেবারিট বললেও টপ ফেবারিট বলছে না। কারো কারো মতে, আর্জেন্টিনা বাতিলের খাতায় থাকতো যদি না তাদের মেসি থাকতো। আর এই তকমা না থাকায় নির্ভার মেসিরা। চাপ অন্যদের থেকে কম। যেটা মেসিদের বিশ্বকাপ জয়ে ভালো প্রভাব রাখতে পারে।

 

রুম নম্বর ২২১
মস্কোয় তখন মাঝরাত, হুকোভস্কি বিমানবন্দরের বাইরে তখন কয়েকশ’ মানুষের ভিড়। কারও হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা, কারও হাতে মেসির ছবি- সবাই এসেছেন রাশিয়ায় পা রাখা আর্জেন্টিনা দলকে শুভেচ্ছা জানাতে। বিমানবন্দর থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে টিম বাসে চড়ে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে অপেক্ষমাণ ও সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নেড়েছেন মেসি। হাসিতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি তৈরি হয়েই এসেছেন।

মস্কো শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে ব্রনিতসিতে ওই রাতেই চলে যান মেসিরা। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ক’টা দিন সেখানেই ঘাঁটি গেড়েছে আর্জেন্টিনা। রাশিয়ার ওই ছোট্ট শহরটিও এখন সেজে উঠেছে যেন আর্জেন্টিনার রঙে। মেসিরা ওই শহরেরই একটি বাংলো ধরনের বাড়িতে থাকবেন। বাংলোর সামনে মেসিদের বড় বড় পোস্টর-বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে।

আর্জেন্টিনা দলের ম্যানেজার মেসিদের আগেই এখানে এসেছেন। সব তদারকি করেছেন। দু’দিন আগে তিনিই সাংবাদিকদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন গোটা বাংলোটা। যেখানে তারকা বলে আলদা কোনো রুম রাখা হয়নি মেসির জন্য। বরং তারই অনুরোধে দু’জনের এক রুমে মেসি শেয়ার করছেন আগুয়েরোকে।

রুম নম্বর ২২১- আগামী ক’দিন এটিই মেসির ঠিকানা। আগুয়েরোর সঙ্গে মেসির বন্ধুত্বটা অনেক দিনের, একই বয়সী দু’জন। জাতীয় দলেও খেলা শুরু করেছেন প্রায় একই সময়ে। জাতীয় দলের হয়ে কোথাও খেলতে গেলে একই রুমে থাকেন দু’জন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

রাশিয়ায় মেসিদের এই বাংলো বাড়ি গোছানো হয়েছে তাদেরই পছন্দের মতো করে। এন্টারটেইনমেন্ট রুমে বড় বড় এলইডি টিভি ছাড়াও থাকছে টেবিল টেনিস, ফুটভলি, বাস্কেটবল, ফুট টেনিস খেলার সুযোগ। ডার্ট বোর্ড, পাঞ্চিং ব্যাগ, সফট আরচারি- অল্প সময়ের জন্য ইনডোরে খেলার সব রকম সুবিধাই আছে সেখানে। কিচেনে ৭-৮টা বারবিকিউ বসানো আছে।

চারজন শেপ সঙ্গে করে নিয়ে আসা হয়েছে। তারা এখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ‘দুলসে দে লেচে’ বা মিষ্টি দুধের একটি খাবার তৈরিতে। মেসির প্রিয় পানীয় ‘মাতে’ও থাকছে। এবারের বিশ্বকাপ মিশনে আর্জেন্টিনার কিছু ফুটবলারের সঙ্গে তাদের পরিবারও এসেছে। মেসির পরিবারও আসবে খেলা শুরুর পর। তাই এই বাংলোতে ছোটদের খেলার জন্যও আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে।

খেলোয়াড়দের স্ত্রী ও বান্ধবীদের সময় কাটানোর জন্যও আলাদা কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অত্যাধুনিক জিম, সুইমিং পুল- সব মিলিয়ে এক মাসের বিশ্বকাপ আসরের জন্য সব প্রস্তুতিই সেরে নিয়েছে আর্জেন্টিনা দল। নিরিবিলি এই শহরটি এখন মেসিদের আগমনে যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখানে আসার পর থেকে বাংলোর আশপাশে উৎসুক জনতার ভিড়। মাত্র ২০ হাজার মানুষের বাস এই শহরে।

সেখানে শহরের ঢোকার মুখে প্রধান সড়কের পাশে মেসির বিশাল এক বিলবোর্ড হাতে এসেছেন সার্জিও ইরোফেয়েভ। ‘আমি আমার সময়ের সেরা ফুটবলারের ছবি এঁকেছি। এটা আমার শহরের পক্ষ থেকে প্রিয় অতিথির জন্য একটি উপহার।’ ইরোফেয়েভের মতোই শহরের অনেকেই তাদের বাসার সামনে মেসি এবং আর্জেন্টিনা দলের ছবি এঁকে রেখেছেন।

এদিন বার্সেলোনা থেকে মেসিরা এসেছেন বিখ্যাত ব্র্যান্ড রোলিং স্টোনের বিমানে চড়ে, যা নিয়ে দিবালারাও নিজেও বেশ উচ্ছ্বসিত। বিমানে ওঠার আগেই আর্জেন্টিনা তারকাদের অনেককে সেলফি তুলতে দেখা যায়। মেসি যেমন তার রুম পার্টনার হিসেবে আগুয়েরোকে বেছে নিয়েছেন। তেমনি দিবালা থাকছেন তার ক্লাব সতীর্থ হিগুয়াইনের সঙ্গে, রুম নম্বর ২২০।

ইসরায়েলের সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচ বাতিল হওয়ার পর মাঝে ক’দিন বার্সাতেই অনুশীলন করেছে আর্জেন্টিনা দল। রাশিয়াতে এসেও কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ নেই তাদের। ১৬ জুন সরাসরি গ্রুপ পর্বে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই শুরু হবে মেসিদের বিশ্বকাপ মিশন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *