রাঙামাটির নানিয়ারচরে পাহাড় ধসে নিহত ১০

রাঙামাটি প্রতিনিধি : ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসে রাঙামাটির নানিয়ারচরে ১০ জন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বড়কূলপাড়া একই পরিবারের তিনজন, হাতিমারায় তিনজন ও শিয়াইল্লাপাড়া গ্রামে শিশুসহ চারজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নয়জনের পরিচয় পাওয়া গেছে, তারা হলেন- নানিয়ারচরে বড়কূলপাড়ার সুরেন্দ্র লাল চাকমা (৪৮), তার স্ত্রী রাজ্য দেবী চাকমা ও মেয়ে সোনালী চাকমা (০৯)। হাতিমারা গ্রামের রুমেল চাকমা (১২), রিতান চাকমা (২৫) ও রীতা চাকমা (১৭)। শিয়াইল্লাপাড়া গ্রামের ফুলদেবী চাকমা (৩২), ইতি চাকমা (২৪) ও শিশু অজ্ঞাত (২ মাস)।
এ ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। এতে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নানিয়ারচর থানার ওসি আবদুল লতিফ বলেন, নানিয়ারচরের তিন গ্রাম থেকে ১০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এটা একটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।
ঘটনার পর থেকে উপজেলায় অধিকাংশ এলাকাই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

 

‘মৃত্যুকূপেই’ আবার বসতি
রাঙামাটি পৌর সদরের পোস্ট অফিস কলোনির বাসিন্দা অটো রিকশাচালক ফজল করিমের ঘরটি গত বছরের পাহাড় ধসের সময় মাটিচাপা পড়েছিল। এতে তার ছোট ছেলে মুন্না মারা যায়, ঘরের ভেতর গলা পর্যন্ত চাপা পড়েছিলেন ফজলও। তাদের পাশের বাদল দত্তের ঘরও মাটিচাপা পড়ে তার দুই সন্তান সুমন দত্ত ও রূপম দত্ত মারা গিয়েছিল।
পাহাড় ধসের পর বাদল দত্ত তার ঘরের জায়গা বিক্রি করে এলাকা ছাড়লেও ফজল করিম ‘মৃত্যুক‚প’ বলে পরিচিতি পাওয়া সেই স্থানেই নতুন করে ঘর তুলে স্ত্রী ও অন্য সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন।


শুধু ফজল করিম নন, রাঙামাটি সদরের ভেদভেদির নতুনপাড়া, সনাতনপাড়া, কিনামনি ঘোনা, যুব উন্নয়ন, শিমুলতলীসহ গত বছর যেসব এলাকায় ভয়াবহ পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যুসহ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেখানে নতুন করে বসতি তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। বৃষ্টি হলে ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটালেও জায়গার মায়া তাদের অনেককে নিয়ে এসেছে আবার ঝুঁকিপূর্ণ বাসে। তবে ধসে মানুষ মারা গেছে এমন কয়েকটি জায়গার অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে অন্য স্থানে থাকছেন। আবার অনেকেই নিজেদের দখল বজায় রাখতে নতুন করে ঘর ওঠালেও তাতে না থেকে অন্য স্থানে বাসা ভাড়া করে বসবাস করছেন।
গত বছরের ১২ জুন ভয়াবহতম পাহাড় ধসে ১২০ জন নিহত হন রাঙামাটি জেলাতেই। এর মধ্যে ৭৩ জনই মারা যান রাঙামাটি সদর উপজেলায়। এর বাইরে কাউখালী উপজেলায় ২১ জন, কাপ্তাইয়ে ১৮ জন, জুরাছড়িতে ছয়জন ও বিলাইছড়ি উপজেলায় দুজন নিহত হন। এছাড়া এ ঘটনায় আহত হন সর্বমোট ১৯২ জন। ওই ঘটনার এক বছর পর বর্ষা মৌসুমের আগে সম্প্রতি রাঙামাটি সদরের ওই সব এলাকা ঘুরে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি গড়ার চিত্র চোখে পড়েছে। পোস্ট অফিস কলোনির ফজল করিমের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা গেছে, ধসে পড়া পাহাড়ের পাদদেশেই দুই কক্ষের টিনের চালার বেড়ার ঘর তোলা হয়েছে। তার পাশেই ভেঙে পড়া বিদ্যুতের খুঁটিটি গত বছরের পাহাড় ধসের ভয়াবহতার চিহ্ন এখনো বহন করছে। এর পাশেই পাহাড় লাগোয়া বাবুল দত্তের ধসে পড়া ঘরটি মাটি কেটে সমতল করা হয়েছে।
বাড়ির সামনেই ফজল করিম বলেন, পাহাড় ধসের পর আমরা পাশের এলাকায় ভাড়াঘরে ছিলাম। পাঁচ মাস আগে ঘর মেরামত করে স্ত্রী ও ছেলে রমজানকে নিয়ে এখানে এসে উঠেছি। ঝুঁকি জেনেও কেন এখানে থাকছেন জানতে চাইলে ফজল করিম বলেন, কী করব, নিজের জায়গা, অন্যখানে থাকতে বেশি টাকা লাগছে। সে কারণে ঘর মেরামত করে থাকছি। তবে বৃষ্টি হলে আতঙ্কে রাত কখনও কখনও নির্ঘুম কাটে বলে স্বীকার করেন তিনি।
পাহাড় ধসে গত বছর দুই ছেলে হারানো বাবুল দত্তের পরিবার ওই জায়গা এক লাখ ২০ হাজার টাকা শামীম নামে এক দোকানির কাছে বিক্রি করে এলাকা ছেড়েছেন। বাবুল দত্তের বিক্রি করা জায়গায় নতুন করে বসতি করার জন্য মাটি কেটে সমতল করা হয়েছে। ফজল করিম জানান, বাবুল ও তার স্ত্রী ভেদভেদির লোকনাথ মন্দির সংলগ্ন এলাকায় মেয়ের সঙ্গে থাকছেন। তাদের বিক্রি করা জায়গাতেও নতুন করে ঘর হবে। সদরের সনাতন পাড়ায় পাহাড় ধসে নিজ ঘরে নিহত হন গোপাল মল্লিকের ছেলে লিটন মল্লিক, তার স্ত্রী চুমকী ও তিন বছর বয়সি আয়ুস মল্লিক। ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ধসে পড়া পাহাড়টি আগের মতো থাকলেও গোপাল মল্লিকের বাড়িটি নতুন করে মেরামত হয়েছে। ঘরের বাইরে লেগেছে টিনের শক্ত সীমানা। সন্তান, ছেলের বৌ-নাতি হারানোর পরও কেন ঝুঁকি নিয়ে থাকছেনÑ জানতে চাইলে লিটনের মা বাসনা মল্লিক বলেন, নিজেদের ভিটে ছেড়ে কই আর যাব।
ভয় আছে, তবুও দখল রাখতে বসতি
ভেদভেদি যুব উন্নয়ন এলাকার কিনামনি ঘোনা এলাকায় গত বছরের পাহাড় ধসের আগে ২৩টি পরিবার বসবাস করতো। ১২ জুনের পাহাড় ধসে মারা যায় পাড়া প্রধান কিনামনি চাকমাসহ ছয়জন। পাহাড় ধসের পর সেখানকার দুই পরিবার এলাকা ছেড়েছে। পাহাড় ধসে সেখানকার কমপক্ষে ১০টি ঘর পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেখানেও পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে ঘর উঠছে। কিনামনি ঘোনার বাসিন্দা কল্প চাকমা বলেন, গত বছর তাদের ঘর সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পাশের সোনামনি চাকমা ও দেবী চাকমার ঘর পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়।
সোনামনি চাকমার পরিবারের তিনজন নিহত হন। দেবী চাকমাদের ঘরটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। কল্প চাকমা বলেন, যাদের লোক নিহত হয়েছে তারা আর নতুন করে বসতি গড়তে আসেননি। কিন্তু যাদের ঘর ভেঙে গেছে তারা কেউ ছয় মাস, কেউ তিন মাস পর নতুন করে ঘর তুলেছে। চল্লিশোর্ধ্ব দেবী চাকমা বলেন, তিন মাস পরিবার নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে ছিলেন। সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ফিরে এসে নতুন করে ঘর তুলেছেন। ঝুঁকি নিয়ে কেন থাকছেনÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভয় লাগলেও থাকতে হয়। নিজের ভিটা ছেড়ে কোথায় যাবো। নিজের জায়গা সে কারণেই ভয় নিয়ে থাকছি। পাশের খাড়া ন্যাড়া পাহাড় দেখিয়ে দেবী চাকমা বলেন, রাতে যখন বেশি বৃষ্টি হয় তখন গা কাঁপে। জেগে থেকে কোনো রকমে রাত পার করি।
গত বছরের ধসে ওই এলাকার নিবারণ চাকমার ঘরটি পুরোপুরি বিলীন হয়। সেখানেই খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে ঘর তোলা হয়েছে। নিবারণ চাকমার মেয়ের পরিবারও সেখানে ঘর তুলেছে। নিবারণের মেয়ে শেফালী চাকমা বলেন, ভয় লাগলেও কী করব? থাকতে তো হবে। রাঙামাটি সদরের নতুন পাড়া, শিমুলতলী, যুব উন্নয়নসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেখানকার বাসিন্দারা গত বছরের ভয়াবহ পাহাড় ধসের পর সরে পড়লেও ধীরে ধীরে ফিরে এসে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি গড়ছেন। ভেদভেদি নতুন পাড়া মসজিদের পাশে পাহাড়ের ঢালে গত বছরের ১২ জুন মারা যান অটো রিকশাচালক নবী হোসেন, তার ঘরের লজিং শিক্ষকসহ ছয়জন। বেঁচে গিয়েছিল তার দুই সন্তান সুমন ও রুবেল। সেই ভিটেতে নতুন করে টিনের ঘর উঠলেও সেখানে এখন আর কেউ থাকেন না। নবীর দুই সন্তানের একজন বিজিবিতে চাকরি করেন এবং অন্যজন তবলছড়ি এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থেকে অটো রিকশা চালান।
পাশের বাড়ির বাসিন্দা অটোরিকশা চালক আবদুল খালেক বলেন, শুধু দখল ঠিক রাখতেই নতুন ঘর (নবী হোসেনের ছেলেরা তুলেছেন) তোলা হয়েছে। নবী হোসেনের দুই সন্তানের ঘরের আশপাশে পাহাড়ের ওপরে ও পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চার-পাঁচটি ঘর। দেখলেই মনে হবে যেন এখনই ভেঙে পড়বে। খালেক বলেন, সিদ্দিক ড্রাইভার, আজম, ওহিদসহ বেশ কয়েকজনের কেনা জমির উপর এসব ঘর হয়েছে। গতবারের ভয়াবহ ধসের পর রাঙামাটি পৌরসদরসহ পুরো জেলায় ৩৩৭৮ পরিবারের প্রায় ১৫ হাজার লোক পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছে বলে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। তাদের হিসাবে, শুধু রাঙামাটি পৌর সদরের নয় ওয়ার্ডের ৩৪টি এলাকায় ৬০৯টি পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। তিনি বলেন, যারা ঝুঁকি নিয়ে আছে তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে ঘর তুলতে দেওয়া হচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *