রাজাপুরে আশ্রয়ণ-২ ঘর নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার

গাজী গিয়াস উদ্দিন বশির, ঝালকাঠি থেকে: ঝালকাঠির রাজাপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ঘর নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ প্রকল্পে ঘর তৈরিতে প্রকল্পের নীতিমালার তোয়াক্কা না করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। আশ্রয়ন প্রকল্প নীতিমালায় পিআইসির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কাজটি করার কথা থাকলেও পিআইসির সভাপতি একক ক্ষমতাবলে তার পছন্দের অফিস স্টাফ মোঃ শাহ-জামাল ও মঠবাড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড মেম্বর নাসির উদ্দিন তারা মিয়ার সহযোগিতায় পিআইসির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজেই কাজের ঠিকাদার হিসাবে রয়েছেন বলে জানা গেছে। সভাপতি নির্বাহী অফিসারসহ পাঁচ সদস্যের পিআইসির অন্য সদস্যরা হলেন পিআইও (সদস্যসচিব), উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা।
ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্য জানান, কাজের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হলেও এখনো ১০৮টি ঘরের মধ্যে একটিরও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি।
অফিস সূত্রে জানা যায়, এ প্রকল্পের অধীন রাজাপুর উপজেলায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০৮টি ঘরের জন্য এক কোটি আট লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ১৮টি করে ঘর নির্মাণ করা হবে।
১৭৫ বর্গফুটের ঘর নির্মাণে কাঠের দরজা-জানালা তৈরিতে শাল, গর্জন, জামরুল, কড়ই, শিশু, আকাশমণি প্রভৃতি গাছের কাঠ ব্যবহারের কথা থাকলেও নি¤œমানের (কচি গাছ) কাঠ দিয়ে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। ফলে ঘরের স্থায়ীত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে সুবিধাভোগীসহ পিআইসি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। সিডিউলে ১৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ঘরে ১৭টি পিলার মূলঘর ও বারান্দা এবং ল্যাট্রিনে চারটি করে পিলার দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ঘরের জন্য চার বর্গইঞ্চির পিলারের উচ্চতা ১২ ফুট, বারান্দা ও ল্যাট্রিনের পিলারের উচ্চতা ১০ ফুট। প্রতিটি খুঁটি তৈরিতে ৪টি রডের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে নি¤œমানের ৩টি রড। প্রতি ফিটে ১টি করে রিং দেয়ার কথা থাকলেও রিং দেয়া হয়েছে ২ফিট পরপর তাও রড দিয়ে তৈরি করছে না। ২ হাজার ১শ’ টাকা ব্যয়ে চারটি জানালায় লোহার গ্রীল দেয়ার কথা থাকলেও দিচ্ছে না। ঘর নির্মাণের আগেই ঘরের পিলারে ইতিমধ্যেই ফাটল দেখা গেছে। ফ্লোর নির্মাণে দেয়া হচ্ছে না ভিটে বালু, মাটির উপরে নি¤œমানের ইট দিয়ে তার উপরেই ঢালাই দেয়া হচ্ছে।
প্রকল্প থেকে লুটপাটের জন্য ঘর নির্মাণে প্ল্যান, ডিজাইন প্রাক্কলন মোতাবেক গুণগত মান বজায় রাখা হয়নি। প্রতি ঘর ১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণের কথা থাকলেও তা ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় সম্পন্ন করে বাকি টাকা তাদের পকেটে। প্রকল্পের আওতায় এ ঘর নির্মাণে ১ লাখ টাকার মধ্যে সম্পন্ন করে সুবিধাভোগীদের বুঝিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও ঘর নির্মাণ সামগ্রী নির্মাণ স্থানে নিতে সুবিধাভোগীকে গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত টাকা। আর এসব অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের সাথে পিআইসির সভাপতিসহ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার যোগসাজসে তার অফিস সহকারি বিজন কুমার, পিআইসির সভাপতি ইউএনও এর পছন্দের অফিস স্টাফ মোঃ শাহ-জামাল (নাজির)ও স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোঃ নাসির উদ্দিনরা জড়িত বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
মঠবাড়ি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী মোসাঃ কহিনুর বেগম জানান, এখন পর্যন্ত তার ঘরের চৌহদ্দি ছাড়া আর কিছুই হয়নি। তা-ও আবার মাটি না খুড়ে মাটির উপড়ে। মঠবাড়ি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী মোসাঃ পারুল বেগম জানান, তার ঘরের মেঝে তৈরিতে ঠিকাদার পলিথিন ব্যবহার না করায় সে নিজে পুরাতন পলিথিন কুড়িয়ে তার মেঝেতে বিছিয়ে দিয়েছে। ঘর নির্মাণ সামগ্রী ব্রিজের কাছ থেকে নির্মানস্থানে নিতে ২,৩৫০ টাকা দিতে হয়েছে পরিবহন খরচ।
মঠবাড়ী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সুবিধাভূগী গোপাল শীল জানান, মালামাল সবকিছুই নি¤œমানের। আমার বাড়িতে আনতে দুটি পিলার ভেঙ্গে গেছে এবং ৩টি করে রড দিয়ে পিলার তৈরি করেছে। মঠবাড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী মোঃ বাবুল হাওলাদার জানান, ঘর নির্মাণ সামগ্রী ঘাট থেকে নির্মাণ স্থানে নিতে তাকে নিজেই বহন করতে হয়েছে। মঠবাড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী অমল চন্দ্রশীল জানান, ঘরের মেঝে তৈরিতে তার স্ত্রী খেটে যাচ্ছে। ঠিকাদারের লোক ৭নং ওয়ার্ডে মেম্বর মোঃ নাসির উদ্দিন তারা মিয়া মেঝেতে পলিথিন বিছাতে পলিথিন ক্রয় করে নিতে বলেছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ লুৎফুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রয়ন-২ চলমান প্রকল্পের কাজ নিজেই করান, আমাকে কোনো কিছুই জানাননি।
আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর ব্যাপারে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাছরিন সুলতানা জানান, শুনেছি বরাদ্দ এসেছে, কাজ শুরু হয়েছে কিনা আমি জানিনা, ইউএনও স্যার জানেন।
মঠবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মোস্তফা কামাল সিকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমার সাথে আলোচনা করেছে আমি বিষয়টি জানি। কিন্তু কাজের সাথে আমি জড়িত নই।
পিআইসি কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আফরোজা বেগম পারুলের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ৩০জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও অর্থ বরাদ্দ আসতে বিলম্ব হওয়ায় কাজে একটু বিলম্ব হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *