একনজরে দিয়েগো ম্যারাডোনা

স্পোর্টস ডেস্ক: ২৫ নভেম্বর না ফেরার দেশে চলে গেছেন বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি তারকা আর্জেন্টিনার ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা। তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়েছে।

তিনি আর্জেন্টিনীয় ফুটবল কোচ ও ম্যানেজার ছিলেন। অনেক বিশেষজ্ঞ, ফুটবল সমালোচক, প্রাক্তন ও বর্তমান খেলোয়াড় এবং ফুটবল সমর্থক তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে গণ্য করেন। তিনি ফিফার বিংশ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়ে পেলের সাথে যৌথভাবে ছিলেন।

ম্যারাডোনাই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুইবার স্থানান্তর ফি এর ক্ষেত্র বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। প্রথমবার বার্সেলোনায় স্থানান্তরের সময় ৫ মিলিয়ন ইউরো এবং দ্বিতীয়বার নাপোলিতে স্থানান্তরের সময় ৬.৯ মিলিয়ন ইউরো।

প্রতিভার ঝলকে ১৬ বছর বয়সেই অভিষেক হয়ে যায় আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে। বয়স কম বলে ১৯৭৮ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপে ১৭ বছর বয়সী ম্যারাডোনাকে দলে রাখেননি কোচ সেসার লুইস মেনোত্তি। পরের বছর বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে অসাধারণ নৈপূণ্যে তিনি শিরোপা এনে দেন আর্জেন্টিনাকে। নিজে গোল করেন ৬ ম্যাচে ৬টি।

বিশ্ব ফুটবল তখন এক মহাতারকা আগমণী বার্তা পেয়ে গেছে। তাকে নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সে ৫ বছরের অধ্যায় শেষে ১৯৮১ সালে তিনি যোগ দেন বোকা জুনিয়র্সে। শৈশবের প্রিয় ক্লাবের হয়ে অভিষেকেই করেন জোড়া গোল।

নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারে মারাডোনা আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স, বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া এবং নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেছেন। ক্লাব পর্যায়ে তিনি তার নাপোলিতে কাটানো সময়ের জন্য বিখ্যাত, যেখানে তিনি অসংখ্য সম্মাননা জিতেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ৯১ খেলায় ৩৪ গোল করেন।

তিনি চারটি ফিফা বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। যার মধ্যে ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপ, যেখানে তিনি আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন এবং দলকে বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেন। প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বর্ণগোলক জিতেন তিনি।

প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ২–১ গোলে জয় লাভ করে। আর্জেন্টিনার পক্ষে উভয় গোলই করেন মারাডোনা। দুইটি গোলই ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে দুইটি ভিন্ন কারণে।

প্রথম গোলটি ছিল হ্যান্ডবল যা “হ্যান্ড অফ গড” নামে খ্যাত। দ্বিতীয় গোলটি মারাডোনা প্রায় ৬০ মিটার দূর থেকে ড্রিবলিং করে পাঁচজন ডিফেন্ডারকে পাশ কাটিয়ে করেন। ২০০২ সালে ফিফাডটকম এর ভোটাররা গোলটিকে শতাব্দীর সেরা গোল হিসাবে নির্বাচিত করে।
ম্যারাডোনাকে ক্রীড়া জগতের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সংবাদ হিসেবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের অন্যতম মনে করা হয়। ১৯৯১ সালে ইতালিতে ড্রাগ টেস্টে কোকেইনের জন্য ধরা পড়ায় ১৫ মাসের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হন তিনি।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইফিড্রিন টেস্টে ইতিবাচক ফলাফলের জন্য তাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০০৫ সালে তিনি তার কোকেইন নেশা ত্যাগ করেন। তার কড়া রীতি মাঝেমাঝে সাংবাদিক এবং ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের সাথে তার মতভেদের সৃষ্টি করে।

ম্যানেজার হিসেবে খুব কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ২০০৮ সালের নভেম্বরে তাকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব দেয়া হয়। ২০১০ বিশ্বকাপের পর চুক্তি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আঠারো মাস এই দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর এক কারখানা শ্রমিকের ঘরে জন্ম ম্যারাডোনার। বাবা-মার ৮ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। ম্যারাডোনার বাবার নাম দিয়েগো মারাডোনা সিনিয়র এবং মা’র নাম দালমা সালভাদর ফ্রাঙ্কো। তার বাবা একজন আমেরিকান এবং মা ক্রোয়েশিয়ান। ১৯৮৪ সালের ৭ নভেম্বর, বুয়েনোস আইরেসে ফিয়ান্সি ক্লদিয়া ভিয়াফানিয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ম্যারাডোনা।

তাদের দুইটি কন্যা সন্তান রয়েছে: দালমা নেরেয়া (জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৭) এবং হিয়ানিয়া দিনোরাহ (জন্ম ১৬ মে ১৯৮৯), যিনি ২০০৯ সালে মারাডোনা প্রথম দৌহিত্র বেনজামিন আগুয়েরো জন্ম দেন।

ম্যারাডোনা এবং ভিয়াফানিয়ের বিচ্ছেদ হয় ২০০৪ সালে। তাদের কন্যা দালমা পরবর্তীতে বলেছিলেন যে এটিই ছিল সকলের জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান, কেননা তার বাবা-মা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তাদেরকে অনেক অনুষ্ঠানে একসাথে দেখা গেছে, যার মধ্যে ২০০৬ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার খেলাগুলো অন্যতম।

বিবাহবিচ্ছেদ অগ্রসর হওয়ার সময়, স্বীকার করেন যে তিনি দিয়েগো সিনাগ্রার বাবা (জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬)। দিয়েগো জুনিয়র ২০০৩ সালের মে মাসে প্রথম ম্যারাডোনার সাথে সাক্ষাৎ করেন। দিয়েগো সিনাগ্রাও একজন ফুটবলার যিনি বর্তমানে ইতালিতে খেলছেন।

বিচ্ছেদের পর, ক্লদিয়া একজন থিয়েটার প্রযোজক হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা করেন এবং দালমা চেষ্টা করতে থাকেন অভিনেত্রী হিসেবে ক্যারিয়ার গঠনের। তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাক্টর’স স্টুডিওতে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।

তার কনিষ্ঠ কন্যা হিয়ানিয়া বিয়ে করেন ম্যানচেস্টার সিটি স্ট্রাইকার সার্জিও অ্যাগুয়েরোকে। তাদের একটি পুত্র সন্তান আছে, যার নাম বেনজামিন (জন্ম ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯)।

ম্যারাডোনা মা, দালমা ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর মারা যান। সে সময় মারাডোনা দুবাইয়ে ছিলেন এবং তাকে দেখার জন্য সময়মত আর্জেন্টিনা পৌছার চেষ্টাও করেন, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে যায়। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৮১ বছর। ম্যারাডোনার পুত্র দিয়েগো ফেরন্যান্দো তার প্রাক্তন সঙ্গিনী ভেরনিকা ওজেদার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে।

ম্যারাডোনা ফুটবল বোঝার আগেই তার ফুটবল প্রেমের শুরু। উপহার পাওয়া ফুটবল নিয়ে ঘুমাতে যেত ছোট্ট ম্যারাডোনা। বস্তিতেই তার ফুটবল খেলার শুরু। দারিদ্রপীড়িত জীবনে মুক্তির অবলম্বন ছিল তাদের কাছে ফুটবল। ৮ বছর বয়সে তার ফুটবল প্রতিভা চোখে পড়ে এক স্কাউটের। তিনি ম্যারাডোনাকে নিয়ে যান আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স ক্লাবে।

এরপর কেবলই ফুটবল জাদুতে মুগ্ধ করার পালা। ১৬তম জন্মদিনের আগেই ওই ক্লাবের হয়ে আর্জেন্টিনার প্রিমেরা ডিভিশনে অভিষেক। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে তিনিই ছিলেন সেই সময় সর্বকনিষ্ঠ। প্রতিভার ঝলকে ১৬ বছর বয়সেই অভিষেক হয়ে যায় আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে।

১২ বছর আগের এক বিকেলে মোহনবাগানের সবুজ গালচেতে পা পড়েছিল ফুটবল রাজপুত্র ম্যারাডোনার। ১১ মিনিট মাঠে ছিলেন। আর ওই ১১ মিনিট তিনি ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন।

মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন উপস্থিত সবাই। বল নাচছে তাঁর শরীরের সব অঙ্গে। পা থেকে উরু, উরু থেকে কাঁধ, কাঁধ থেকে বল মাথায়। তার পরেই সেই বল শট করে গ্যালারিতে ফেলছেন আর্জেন্তিনার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিধারী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *