এক্সিলেন্ট দে-ছুট ল্যান্ড

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম : প্রকৃতির খেয়াল বুঝা বড় দায়। পৌষের শীতে সাগর, নদী, খাল, বিল সব শান্ত। সেই সুযোগেই দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরা বিজয় দিবস উদযাপনের জন্য ছুটল বঙ্গপোসাগরের অথৈ পানিতে জেগে উঠা এক চরে। ঢাকা শহরের যানজট ঠেলেঠুলে লঞ্চ ছাড়ার কিছুক্ষণ বাকি থাকতেই, একে একে বারোজন ভ্রমণ বন্ধু সদরঘাট টার্মিনালে হাজির হই। তিনদিনের ছুটি পেয়ে ভ্রমণ, নির্বাচনী কার্যক্রম ও বাড়ি ফেরা – সব মিলিয়ে মাত্রার অতিরিক্ত যাত্রি। লঞ্চের ডেঁকে হাঁটার সুযোগ নেই। কেবিন ছাড়া যাত্রিরা যে যার মতো শুয়ে-বসে আছে। ভাগ্যিস নৌ-টার্মিনাল সংশ্লিষ্ট বন্ধু সোহেল আগেভাগেই আমাদের জন্য দুটো ডিলাক্স কেবিন বরাদ্দ রেখেছিল।

৬টা ৪০ মিনিটে হুইসেল বাজিয়ে ঘাট ছেড়ে যায় লঞ্চ। ফতুল্লা যেতেই সংগঠনের ব্যানার বারান্দায় টাঙানো হয়। এবারের ভ্রমণের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘যদি তুমি প্রকৃতিপ্রেমি হতে চাও- তাহলে নিজের বিছানা নোংরা করো প্রথমে।’

লেখাটা ফেসবুকে আপলোড দেয়ার পর থেকেই অনেকে প্রশ্ন করেছিলেন কি বুঝাতে চেয়েছি। তাই দে-ছুট ফেসবুক গ্রæপ হতে লাইভে এসে বিষয়টা পরিষ্কার করে দেই। কেউ যদি তার নিজের বিছানা নোংরা দেখতে পছন্দ না করে তাহলে তার দ্বারা প্রকৃতি ও পরিবেশও নোংরা হতে পারবে না।

আমরা যেখানে ভ্রমণে যাই সেসব জায়গাগুলো হলো প্রকৃতির চাদর। অথচ আমরা অনেকেই জেনে / না জেনে প্লাস্টিকের গøাস, প্লেট, বোতল, চিপ্স-চকলেটের মোড়কগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে আসি। যা কয়েক যুগেও পচে না। এতে প্রকৃতির মারাত্মক দূষণ ও বিপর্যয় ঘটে। অথচ একটু সচেতন হলেই তা রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা দুর্গম অঞ্চলের নয়ানাভিরাম কোথাও ভ্রমণে গেলে, খাবারের পাত্র হিসেবে কলাপাতা ব্যবহার করি। এবার হতে শুরু করেছি বাঁশ দিয়ে তৈরি গøাস।

মোড়ক গোছানোর দায়িত্বে ছিল নিবেদিত প্রাণ হাসিব। এভাবেই যদি প্রতিটি ভ্রমণ সংগঠন ও নিজের মতো করে ঘুরতে যাওয়া ভ্রমণ পিপাসুরা সচেতন থাকে, তাহলে নিজ ঘরে বিছানো সুন্দর চাদরটার মতো এদেশের প্রতিটি পর্যটন স্পট সহ ঘুরতে যাওয়া নানান দর্শনীয় স্থানগুলো আর ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হবে না।

জলজ প্রাণীদের উদোর প্লাস্টিকে ভরবে না। অপচনশীল দ্রব্যের কারণে প্রকৃতি-পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে না। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ ভ্রমণের পাশাপাশি সচেতনতা নিয়েও কাজ করার চেষ্টা করে।

লাইভ শেষে মানিকের আনা ডিম-খিচুড়ি চলল বেশ জোড়েশোরে। এশার নামাজ আদায় শেষে কিছুটা সময় ধরে চললো আড্ডাবাজি। এরপর এক ঘুমে সকাল ৬টায় পটুয়াখালী। ঘাটে আগেই রেডি থাকা মাইক্রোতে চড়ে ছুটি কুয়াকাটা। আড়াই ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাই সাগরপার।

এদিকে শেষ রাত হতেই শান্ত সাগর অশান্ত। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ২নং সতর্ক সংকেত। একেই বলে প্রকৃতির আপন খেয়াল। ভর শীতেও সাগর উত্তাল। তবুও আশাহত নই। নাশতা সারতে সারতেই আমাদের কুয়াকাটা’র ভ্রমণ বন্ধু ওমর মিজান, কাঁচা বাজার নিয়ে এসে হাজির। আর দেরি নয়। যত দেরি ততো হবে কাহিনী।

দ্রæত ঘাটে চলে যাই। ইঞ্জিন বোট নিয়ে শফিক মাঝিও রেডি। শুরুতেই কেন যেন মাঝিটাকে ভাল লাগেনি। তবুও চড়তে হলো। বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটায় উত্তাল বঙ্গোপসাগরের নোনা পানিতে মাঝি ভাসালো বোট। একটা সময় দৃষ্টির সীমা হতে হারিয়ে গেল চলাচলরত অন্যান্য জলযানগুলো। তখন বিশাল দরিয়ার মাঝে শুধু আমরাই। মাঝে মধ্যে গাঙচিল উড়ে যায় আপন মনে। সবাই যখন খোশগল্পে মশগুল তখন মাঝির চিৎকারে উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাই। মোবাইল ফোনে চরের দিক নির্দেশনা চাইতেছে। আর জোরে জোরে বলতে লাগল কুযাশার জন্য দিক হারিয়ে ফেলছে। আমাদের প্রতি কটমট ভাষায় বলতে লাগল বেশি নড়াচড়া করবেন না। সাগরের অবস্থা ভাল না। কথাগুলো তার আঞ্চলিক ভাষায় বলছিল।

তার ভয়ার্ত চিৎকার আমাদেরকে বিচলিত করলো না। বরং জানিয়ে দিলাম-দিক খুঁজে না পেলে বেশ মজাই হবে। ভেসে বেড়াব বঙ্গোপসাগরে। এরকম ভাবলেশহীন কথায় বেটা বেশ বুঝতে পারল, আমরা ওর চাইতে আরো বেশি বড় গুর্দাওয়ালা। হা-হা-হা।

বোট চললো আড়াই ঘন্টার জায়গায় অতিরিক্ত আরো প্রায় সোয়াঘন্টা। এর পর চরের নিশানা পেলাম। সবাই উৎফুল্ল। চুলো, হাড়ি, পাতিল, বাজার-সদাই সব নিয়ে এবার ছোট ডিঙ্গীতে চড়ে পর্যায়ক্রমে দামাল পোলাপানগুলো পার হতে লাগল। একসময় আমিও কয়েজনসহ ডিঙ্গীতে চড়লাম।

তীরে ভিড়ার কাছাকাছি ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে গেল। আনন্দে ডিঙ্গীর আগায় ফটোশ্যুট আর বাঁধন হারা ঢেউয়ের ঝাপটায় পল্টি খেয়ে ভিজে চুবুজুবু। ওদিকে আগেই তীরে ভিড়া মেহেদি হেসে কুটিকুটি। তবে জনাব ইফতেখার ইন্নালিল্লাহ পড়ে দায় সেরেছে।

শরীরে ভিজা কাপড় তাতে কি? ব্যাগ তো আছে, আরে সেটাও তো ভিজেছে। এমনকি কাঁথাবালিশ সহ। তবুও দুঃখ নেই। যখন তাঁবু পাতার জন্য চরের মাঝামাঝি যাই। বুঝতে আর বাকি রইল না যে আমরা এসেছি নীল জলরাশির বঙ্গোপসাগরের বুকে মাথা উচুঁ করা, অপার সৌন্দর্যময় নয়নাভিরাম প্রকৃতির সান্নিধ্যে। সবাই বেশ পুলকিত।

দীর্ঘ পথ পরিক্রমার ক্লান্তি যেন সব ঝড়ে পরল। শুরু হলো দে-ছুটের অপেক্ষাকৃত তরুণদের দৌড়ঝাপ। কেউ মাছ কাটা, কেউ চুলা সেট করা, কেউবা আবার ক্যাম্পিং-এর জন্য তাঁবু টানানোতে মহাব্যস্ত। সাথে নেয়া সিলিন্ডার চুলায়, রফিক ভাই দিলেন ডালে-চালে মিলিয়ে খিচুড়ী বসিয়ে।

বেলাল রাতের বারবিকিউ’র জন্য আনা মাছের আশঁটা ছাড়াতে দিচ্ছে পান্ডিত্যের পরিচয়। জসিম-হানিফ নয়া মোবাইল সেটে ছবি তোলায় এমন ভাব, যেন তারা বিশাল বড় মাপের স্থির চিত্রগ্রাহক। সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা। শুরু হলো প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের থালা, গøাসের বদলে কলাপাতা আর বাঁশের গøাস ব্যবহারে খাওয়া-দাওয়া। এগুলো প্রকৃতিরই দান। যা সহজেই পচনশীল। খানাপিনা শেষে শুরু হয়ে যায় কালামের প্রস্তুতি। আজ রাতে হবে তার রেসিপি’তে আস্ত কোরালের বারবিকিউ।

আমাদের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের তীব্রতাও বাড়তে থাকল। পাথুরে কয়লায় আগুন জ্বলল। নাচ-গানের তালে তালে প্রায় ৫ কেজির মাছটা ঝলসাতে দেরী, কিন্তু কাঁটা সহ উদোরে যেতে সময় লাগল না। ঠান্ডা বাতাসে আর বাইরে থাকা গেল না। তাছাড়া কাল বিজয় দিবস। উঠতে হবে সাতসকাল। সবাই যে যার মতো তাঁবুতে ঢুকে পড়লাম।

বেশ একটা মজার ব্যাপার হলো রাতে তাঁবু বাস হিসেবে এই চরে – কোনো ভ্রমণ দল হিসেবে আমরাই হলাম প্রথম। ঘুমিয়ে যাবার আগের ফিলিংসটা ছিল বেশ এক্সসাইটেড। একেক তাঁবুতে দুই/তিনজন। নানান খাজুরা প্যাচাল পারতে পারতে কে কখন ঘুমে হারিয়ে গেছি টেরই পাইনি। ঘুম যখন ভাঙল তখন মাত্র আলো ফুটছে। ঝটপট সবাই রেডি।

বাঁশের আগায় ডাউস সাইজের লাল-সুজের পতাকা উড়িয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, বীর ও নির্যাতিতদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে দিনের শুরু। ধীরে ধীরে পূব আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের সূর্যোদয়ের জানান দিল। কুয়াকাটা হতে চরটির অবস্থান পূর্ব-দক্ষিণে। পানি পথে প্রায় ৪০ কিঃমিঃ দূরবর্তী গাছপালা, জন্তু, প্রাণী ও প্রায় মানব বসতিহীন চর থেকে দেখা আকাশের রক্তিম আভার রুপ অবিশ্বাস্য ভালোলাগার মতো। যা আজীবনের সুখস্মৃতির গল্প হয়ে রবে।

এবার আমরা আরো এগিয়ে যাই চরের উত্তর দিকে। উত্তাল বাতাসে বাঁশের আগায় থাকা লাল-সবুজের পতাকাটা পতপত করে উড়ে। যতই এগিয়ে যাই ততোই মুগ্ধতা ভর করে। চরের চারদিকে সমুদ্র। টালমাটাল ঢেউ আছড়ে-পারে রেখে যায় শামুক, ঝিণুক। দূর থেকে মনে হবে সাদা শিউলী ফুল, প্রেয়সির আগমনে যতন করে কেউ বিছিয়ে রেখেছে।

আরো কিছুটা আগাতেই চোখে ধরা দেয় ঝাকে ঝাকে পাখি। তাদের ভুবনে আমাদের আগমন মেনে নিতে পারেনি। ভালোভাবে ছবি তোলার আগেই লাপাত্তা। আমরাও আর পাখিদের বিরক্তির কারণ না হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে দক্ষিণে ছুটি। চরটি ২০১৭ সালের শেষের দিকে জেলেদের তথ্যমতে, আরিফ রহমান নামক এক সৌখিন পর্যটক কুয়াকাটার বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা নিয়ে চরটিতে যান। তিনি নাম রাখেন চর বিজয়। যদিও আমি স্থানীয় এক জেলে হতে বেশ কয়েকবছর আগেই চরটির জেগে উঠার খবর পেয়েছিলাম। কিন্তু সময়-সুযোগের অভাবে যাওয়া হয়নি। আরিফ রহমানের তথ্যমতে চরটি বর্ষায় অনেকাংশ ডুবে যায় বিধায় এখনো সরকারীভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি।

চরটির ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক কথায় দারুন। হতে পারে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের জন্য বঙ্গোপসাগরের বুকে সেন্টমার্টিনের মতো আরেক নয়নাভিরাম লিলাভূমি। সেই সুদূরপ্রসারী ভাবনা হতেই সৌন্দর্যের আধার জেগে উঠা চরটির, যুৎসই একটা নাম রাখি এক্সিলেন্ট দে-ছুট ল্যান্ড।

দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য নতুন আশার আলো এক্সলিন্টে দে-ছুট ল্যান্ড এর প্রভুত উন্নয়ন, ভ্রমণ পিপাসুদের সহজ যাতায়াত ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার জন্য কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও রোটারী ক্লাব অব কুয়াকাটা সি-বীচ এর সভাপতি মোতালিব শরীফকে অবহিত করি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেন। প্রয়োজনে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়ারও যথাসম্ভব ব্যবস্থা করে দিবেন বলে জানিয়েছেন। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র অঙ্গিকার- ভ্রমণ পিপাসুরা ঘুরে বেড়াক স্বস্তি ও নিরাপত্তায়।

যাবেন কিভাবে : সদরঘাট নৌ-টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন কোম্পানির লঞ্চ সন্ধ্যা ৬ট হতে ৭টা পর্যন্ত পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সেখান থেকে বাসে বা রেন্টকারে কুয়াকাটা। এছাড়া সায়েদাবাদ ও গাবতলী হতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সরাসরি কুয়াকাটা পর্যন্ত যায়। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকৎ থেকে ইঞ্জিন /স্পীড বোটে এক্সিলেন্ট দে-ছুট ল্যান্ড [চরবিজয়]।

লাগবে ক’দিন: যদি ক্যাম্পিং না করা হয় তাহলে আসা-যাওয়া দুই রাত আর মাঝে একদিন হলেই যথেষ্ট।

খাবেন কি সেখানে: সংখ্যায় দুই/তিনজন হলে জেলেদের কাছ থেকে মাছ-ভাত কিনে খেতে পারেন। লোক সংখ্যা বেশি হলে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ও খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে।

ভ্রমণ তথ্য: পুরো চরে মাত্র কয়েকজন জেলে মাছ ধরার সুবিধার্থে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। দল ভারী না হলে রাতে ক্যাম্পিং করার প্রয়োজন নেই। কুয়াকাটা থেকে সহজ যাতায়াত ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন কুয়াকাটা গেস্ট হাউজের সত্বাধিকারী মাতলুব শরীফ ও ওমর মিজানের সঙ্গে। মোবাইল : ০৪৪২৮৫৬০২৪, ০১৭৬১৭১৫২২৬।
ছবির ছৈয়াল : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *