গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ…

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম: অন্ধকার রাত্রির রেশ তখনো কাটেনি। আনুমানিক সময় তখন ভোর সাড়ে চারটা।
বন্ধু জসিমকে ফোন দিলাম। রাত যত গভীর কিংবা সকাল – ওঁর আয়েশি ঘুম যাই হোক না কেন, আমার ফোন পেলে সে ধরবেই। বললাম ঘুরতে যাব। ফজর নামাজের জন্য সময় চেয়ে নিলো। এরপর দুজনে গিয়ে মিললাম নামাবাজার ব্রিজে। বংশী নদীর উপর করা ব্রিজটি উদ্বোধন হবার পর হতেই,এপাশটায় ভ্রমণ পিপাসুদের বেশ আনাগোনা বেড়েছে।এপার সাভার থানা আর ওপার হলো ধামরাই উপজেলা। ভোরের হাওয়ায় – ব্রিজ হতে দেখা বংশীর সৌন্দর্যও কম যায় না। বংশী নদীর রূপ দেখে, এবার হাঁটতে শুরু করলাম মাখালিয়ার পথে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটছি- মনের ভেতরে গুনগুন করে বাজছে- কবিগুরুর- গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ… আমার মন ভুলায় রে… কিন্তু কিছু দূর গিয়েই, মত পাল্টে ধলেশ্বরী নদীপার যাবার পথ ধরলাম। হাঁটতে হাঁটতে নদীর ঘাটে। খেয়ার অপেক্ষায় দাঁড়াই বটগাছ তলায়। টুপটাপ করে লাল টকটকে বট ফল ঝড়ে পড়ে। অসময়েও কোকিলের সুরেলা কণ্ঠের কুহুকুহু ডাক। ঝড়েপড়া বটফলে গাছতলায় মালার মতো বিছিয়ে রয়েছে। ধলেশ্বরীর রুপটাও বেশ মোহনীয়।


পুরোঘাটে একটিই মাত্র নৌকা। এপাশটায় নদী খুব প্রশস্ত নয়। তাই একটি নৌকা দিয়েই হয়,সারাবছর মানুষ পারাপার। ওই ফাঁকে নদীপার ঘুরে দেখি। নৌকা ঘাটে এলে উঠে বসি। মৃত ধলেশ্বরী, নতুন পানি আসার সমাগমে কিছুটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আফসোস হয় নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোর বেহাল দশা দেখলে। নদী বাঁচাও, নদী রক্ষা করো। কত সভা-সেমিনার, দিন শেষে যে লাউ সে কদুই। নদী নিয়ে ভাবতে ভাবতে খেয়াঘাটে ভিড়ে। হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের মেঠোপথে ঢুকে যাই। গ্রাম আর গ্রাম নাই। আগের মতো মনে হয়, গ্রাম্য মানুষগুলো এখন আর নাই। তারাও হয়তো সারারাত ফেসবুকিং,ইউটিউবে সময় কাটিয়ে,সুন্দর সকালটা ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়। যে কারণে নেই তেমন জনমানব। হাঁটতে হাঁটতে কাঁঠাল গাছতলায় দাঁড়াই। মূলত আজকের প্রাতঃভ্রমণ ফলজ ও সবজি গাছ চেনা। কিছুটা সময় ফটোসেশনের পাশাপাশি কাঠলিচু ও গাব গাছ চেনা হলো। বলে রাখা ভালো, সবজি ও নানান ফলজ গাছ – একজন দক্ষ শিক্ষকের মতো বন্ধু জসিম চিনিয়ে দেয়ার দায়িত্বে ছিলো। গাছ চিনতে চিনতে যখন সবজি ক্ষেতের দিকে যাই,তখন তো চোখ চড়কগাছ। এই কি দেখছি! কুয়াশা ঢাকা সকাল আর ঘাসে ঘাসে রয়েছে শিশির বিন্দু। পুরাইবি টাসকি খাইয়া গেছি। বাংলা শেষ জৈষ্ঠ মাস। যেটাকে বলা হয় কাঁঠাল পাঁকা গরম।
গ্রীষ্মে শিশির বিন্দু দেখতে পাওয়া, ভ্রমণে এক নতুন অভিজ্ঞতা।
হাটঁতে হাঁটতে গ্রামের আরো গভীরে যেতে থাকি। সঙ্গী হয় প্যাচা সহ আরো নানান পাখি। জমির পর জমি চিচিঙ্গা, ঢেঁরস, করলা, কচু ও পাট শাকের ক্ষেত। চক পেরিয়ে লোকালয়ে যেতেই দেখি, ধলেশ্বরী এপাশটায়ও প্যাচিয়ে ফোর্ডনগর গ্রামে ঢুকে গেছে। নদীর তীর ধরে হাঁটতে থাকি। চোখে পড়ে নানান ফলের গাছ। পাকা খেজুর টুপ করে ঝরে পড়ে। পেঁপে গাছের দিকে তাকাতেই দেখি টসটসে পাঁকা পেঁপে। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র দামাল বলে কথা। মালিক খুঁজে বের করি। ভদ্রলোক একপ্রকার জোর করেই গিফট করলেন।
নগদেই পেঁপে কেটে শুরু হয় খাওয়া। খাই আর বলি দোস্তরে হেব্বি টেস্ট।
আসলে সদ্যপাড়া ফরমালিন ছাড়া ফলের স্বাদ-ই ভিন্নরকম। ছোট্ট একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিয়ে এগোতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতে গুদারাঘাট। তলা দিয়া পচা, বিশাল সাইজের কাঁঠাল কিনে বাড়ির পথ ধরি।
যাবেন কিভাবে: ঢাকার গুলিস্তান সহ বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ড হতে ধামরাই, আরিচাগামী বাস ছেড়ে যায়। নামতে হবে সাভার থানা / বাজার বাস স্ট্যান্ড। ভাড়া নিবে জনপ্রতি বর্তমান চার্ট অনুযায়ী ৭০/৮০ টাকা।

সাভার হতে রিক্সা/অটো’তে নামাবাজার ব্রিজ কিংবা ফোর্ডনগর গুদারাঘাট। জনপ্রতি ৫টাকা ভাড়ায় খেয়া পার হয়ে,ইটের সলিং করা সড়কে না গিয়ে, মেঠোপথ ধরে হাঁটতে থাকবেন।
উল্লেখ্য: ফোর্ডনগরকে স্থানীয়রা ফুটনগর হিসেবেই জানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *