দুই সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন চায় বিএনপি


নিজস্ব প্রতিবেদক :
আসন্ন গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণের এক সপ্তাহ আগে থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েন, ইভিএম বন্ধ, গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে প্রত্যাহার, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাসহ নির্বাচন কমিশনের কাছে একগুচ্ছ প্রস্তাব ও দাবি জানিয়েছে বিএনপি। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা এবং চার নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরে। তবে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন ও ইভিএম ব্যবহার বন্ধে বিএনপির দাবি নাকচ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর এসপি হারুনকে প্রত্যাহারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি ইসি।
কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির পক্ষে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। পরে এ বিষয়ে কথা বলেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। গতকাল বেলা ১১টার দিকে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির ৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারদের সাথে বৈঠকে বসেন। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান কামাল ইবনে ইউসুফ, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার।
প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিশনের সঙ্গে বিএনপি আমরা বৈঠক করেছি। দলের মূল দাবিÑ দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সাত দিন আগে যেন সেনা মোতায়েন করা হয়। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন না। নির্বাচনের ওপর ভোটারদের আস্থা নেই। সেনা মোতায়েন হলে এই নির্বাচনে ভোটারদের আস্থা ফিরে আসবে। এই নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিরোধিতার কথা জানিয়ে খন্দকার মোশাররফ বলেন, এ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতার কথা জানানো হয়েছে কমিশনকে। ইভিএম-প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। যেসব দেশের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে, সেসব দেশেও এর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বৈঠকে দুই সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিশনের নির্দেশে বিভাগীয় কমিশনারদের নেতৃত্বে দুটি সমন্বয় কমিটি গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আইনের কোন ধারায় কোন এখতিয়ারে ইসি এই কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। কারণ, অতীতে এ ধরনের কমিটি গঠনের উদাহরণ নেই। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, এ নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে মানুষের মাঝে উৎকণ্ঠা রয়েছে। সবাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। জাতীয় নির্বাচনের আগে দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি নাÑ এ দুটি নির্বাচনে তার ইঙ্গিত থাকবে।
খন্দকার মোশাররফ আরো বলেন, আমরা বলেছি, নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য খালেদা জিয়াকে মুক্ত থাকতে হবে। বিএনপি ও ২০ দল নির্বাচনে অংশ না নিলে তা অংশগ্রহণমূলক হবে না। বৈঠক সূত্র জানায়, ভোটকেন্দ্রগুলোয় আনসার ও ভিডিপি মোতায়েনে সতর্ক থাকতে ইসির প্রতি আহŸান জানিয়েছে বিএনপি। নিজ এলাকায় যেন ওই বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব না পান, সেদিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া কমিউনিটি পুলিশের দায়িত্ব পালনকারীদের নির্দিষ্ট পোশাকের ব্যবস্থা করতে ইসিকে বলেছে বিএনপি। নির্বাচনি প্রচারে সমান সুযোগ সৃষ্টি করারও দাবি জানিয়েছে দলটি। খন্দকার মোশাররফ বলেন, আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে দুই সিটি কর্পোরেশন নিয়ে একগুচ্ছ লিখিত প্রস্তাব দিয়েছি। কমিশন বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে।
গত ৮ এপ্রিল রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠান শেষে সিইসি সেনা মোতায়েন নিয়ে কথা বলেন। ওই দিন সিইসি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘অতীতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন হতে পারে। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা উচিত। তবে স্থানীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন আমরা একেবারেই চাই না।’ বিএনপির দাবি প্রসঙ্গে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গতকাল বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত নেই ইসির। আর ইভিএম ব্যবহার, বিতর্কিত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবির বিষয়ে কমিশন পরবর্তী সময়ে বৈঠকে আলোচনা করবে। কী কী দাবি গ্রহণ করা যায়, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। হেলালুদ্দীন আহমদ আরো বলেন, ইভিএম নিয়ে বিএনপিকে বলা হয়েছে, ইভিএম নিয়ে সন্দেহ থাকলে বিএনপি সেগুলো আগে দেখে যেতে পারে। ইভিএম হ্যাক করার সুযোগ নেই।
বৈঠকে বিএনপি বলেছে, এসপি হারুনকে গাজীপুর থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে ‘পক্ষপাতিত্বের’ কারণে কমিশন তাকে একবার প্রত্যাহার করেছিল। তার মতো সিভিল প্রশাসন ও পুলিশের চিহ্নিত কর্মকর্তাদের বদলি করে পেশাদার কর্মকর্তা দিতে হবে খুলনা ও গাজীপুরে। গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে প্রত্যাহারে বিএনপির দাবি প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, সে বিষয়ে কমিশন সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিএনপির কিছু প্রস্তাব কমিশন আইনানুগভাবে বাস্তবায়ন করবে বলে জানিয়েছে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাসহ অনেক সুপারিশ ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করা হবে। উল্লেখ্য যে, আগামী ১৫ মে ভোটের দিন রেখে গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ঠিক হয়েছে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত।
সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে গাজীপুরে এমএ মান্নান এবং খুলনায় মনিরুজ্জামান মনি বিএনপির মনোনয়নে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার তাদের বদলে গাজীপুরে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন হাসানউদ্দিন সরকার; আর খুলনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে মোট ভোটার রয়েছেন ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৫ জন। আর খুলনা সিটির ৩১টি সাধারণ এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫৪ জন।

Check Also

ক্যাসিনো গল্প সাজিয়ে দুর্নীতি আড়াল করা যাবে না: ফখরুল

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকারে যারা আছেন তারা ৭ নভেম্বর …

রাজমুকুটের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

স্পোর্টস রিপোর্টার : দিল্লির কালো ধুলোবালিতে বাংলাদেশও পেছনে রেখে এসেছে সব গুমোট হাওয়া। সেই সঙ্গে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *