বর্ষায় চলুন ডিঙ্গীপোতা হাওরে

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম: মানুষ মাত্রই মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াতে চায়। মানুষ এমন এক জাতি- এরা বন্দি থাকতে মোটেও পছন্দ করে না। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। একটা সময় সব কিছু থাকতেও, শুধু সময়ের অভাবে মনের ভিতর ঘুরে বেড়ানোর শখটাকে গলাটিপে ধরতে হয়। প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়াতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু জগত সংসারে নানান ঝামেলায় ভ্রমণ শখ পূরণের জন্য সময় আর বের করা যায় না। তাই সময় কারো জীবনে নিষ্ঠুর হওয়ার আগেই ইচ্ছে মতো ঘুরে বড়োনো চাই।

হুট করইে এক রাতে সময়কে তুরি মেরে আমি আর মেহেদি কমলাপুর ট্রেন স্টেশনে গিয়ে উঠে পড়ি হাওর এক্সপ্রেসে। গন্তব্য ভাটি অঞ্চল মোহনগঞ্জ। বহু বছর পরে ট্রেনে চড়লাম। প্রায় পৌনে একঘন্টা লেটে হুইসেল বাজিয়ে ঝিকঝিক শব্দ তুলে ট্রেন ছটেতে শুরু করলো তার গন্তব্যের উদ্দেশে। তাপানুকূল কেবিন। বেশ পরিপাটি। কেবিন বয় নাশতার কথা জানালো। পেট ভরা তবুও হ্যাঁ সূচক জবাব দিতেই সার্ভ করতে দেরি হলো না। খেয়েদেয়ে দুজনেই খুব আরামের একটা ঘুম দিলাম। সকাল ৬টায় মোহনগঞ্জ রেল স্টেশনে নামলাম। বহু বছর পর এদিকটায় আসলাম। কালের পরিক্রমায় অনেক কিছুই বদলে গেছে। যে বদলানোর ঢেউ মানুষের চরিত্রের উপরও আছড়ে পড়েছে। রেল স্টেশনের পাশের হোটেলে তেল ছাড়া মচমচা পরোটা আর ডিম ভাজা দিয়ে সকালের নাশতা সারলাম। আমি আবার ভাটি অঞ্চলে এলে রাস্তার ধারের হোটেলগুলোতে পরোটা না খেলেই নয়। কেন জানি আমার কাছে অন্যরকম স্বাদ লাগে। এবার ফুপা বাড়িতে যাওয়ার জন্য অটো’তে চড়লাম। চতুর চালক সম্ভবত ইচ্ছে করেই প্রথমে ভুল জায়গায় নিয়ে অতিরিক্ত কিছু টাকা খসালো। ওই যে বললাম না, চরিত্রের মাঝেও আছড়ে পরেছে। গাড়ি ঘুরিয়ে এবার গার্লস স্কুলের সামনে এলাম। ফুপাতো ভাই তৌহিদ আগেই অপেক্ষায় ছিল। বিয়ে বাড়ি, অনেক স্বজন সমাবেশ। কিন্তু আমার মনতো পড়ে আছে হাওরের হিজল-করচ গাছের ছায়াতলে। কোনো মতে সবার সঙ্গে হাই-হ্যালো সেরে ছুটলাম তেতুলিয়া। এবার মনে হয় ভাগ্য ভালো। অটো চালককে বেশ ভালোই মনে হলো। গ্রাম্য পথে অটো চলে। যেথায় খুশি সেথায় থামি।

মোহনগঞ্জ একটি প্রাচীন জনপদ। ভাটি অঞ্চলের রাজধানী হিসেবেও খ্যাত। চালক রইস, আমাদের নানান অনুসন্ধানি প্রশ্নে একজন দক্ষ গাইডের মতোই ব্রিফিং দিচ্ছে। গ্রাম্য পথে চলার সময় বাড়তি আনন্দ যোগায় অচেনা পাখির কলতান। পুকুরে দুরন্ত শিশুদের ডিগবাজি, কৃষাণ-কৃষাণীদের লাজুক মিষ্টি হাসি।

চলতে চলতে একটা সময় বুঝে গেলাম, এই অটোচালক লোকটা আসলেই ভালো। নানান আলাপচারিতায় ঘন্টাখানেকের মধ্যেই তেতুলিয়া গ্রামে পৌঁছাই। গ্রামটা খুব সুন্দর। একেবারে ডিঙ্গীপোতা হাওরের তীরেই । গ্রামরে মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচিত হই। এটা-সেটা দোকান থেকে কিনে খাই। বলা যায়, এটা আমাদরে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র অন্যতম হবি। ঘাটে গিয়ে ট্রলারে চড়ি। বিশাল হাওরের বুকে ভেসে বেড়াই। চারদিকে থৈ থৈ নতুন পানি। ভটভট শব্দ তুলে ট্রলার ডিঙ্গীপোতা হাওরে ভেসে বেড়ায়। দূরের এক হিজল গাছের ছায়ায় যাই। চারদিকে অথৈ পানি। মাঝে গাছটি শির উঁচু করে জেগে রয়েছে। এক অন্যরকম ভালোলাগার মুহূর্ত। তাছাড়া বর্ষাতে হাওরের সৌন্দর্য এমনিতেই বেড়ে যায় বহুগুণ। গাছের ডালের সঙ্গে লাগা পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। ট্রলার ছেড়ে গাছে চড়ি। পা ভিজাতেই সারাদেহে অদ্ভুত শিহরণ। আকাশে ভেসে বেড়ায় চিল। নয়া পানিতে মাছের লুকোচুরি। মৎস্য শিকারীরা মাছ ধরায় ভীষণ ব্যস্ত। আমরা খুঁজি জীবনের সুখ। সেই সুখের খুঁজে উকিল মেহেদি বাঁদুড়ের মতো গাছের ডালে ঝুলতে গিয়ে ধপাস করে পানিতে। ও হয়তো জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছে। শেষে আরো কিনা কী খুঁজবে কে জানে!। তাই আর দেরী নয়। মাঝি আবারো ট্রলার ভাসালো।

রইস জানালো, শুকনো মৌসুমে এই ডিঙ্গীপোতা হাওরের বুকে বিভিন্ন জাতের ধান চাষাবাদ হয়। যা দেশের খাদ্যভান্ডারের চাহিদা মিটাতে বেশ সহায়ক হয়। এই মোহনগঞ্জের হাওরগুলো থেকে প্রচুর মিঠাপানির মাছ আহরণ হয়। ডিঙ্গীপোতা হাওর হয়ে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওর পর্যন্ত যাওয়া যায়। যা ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য নতুন কিছু দেখার শখ মিটাবে।

নীল আসমানের তলায় মৃদু বাতাসে হাওর জলে ভাসতে ভাসতে বেলা গড়িয়ে প্রায় মধ্য দুপুর। দিনটি ছিল জুমা বার। নিতে হবে নামাজের প্রস্তুতি। যাই এবার তীরে।

যাবেন কিভাবে : বাস ও ট্রেন, দুভাবেই যাওয়া যায়। সবচেয়ে আরামদায়ক হবে রাতের বাস বা ট্রেনে গেলে। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর থেকে দিনে-রাতে বাস-ট্রেন মোহনগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। মোহনগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে অটো’তে তেতুলিয়া নৌঘাট।

খরচপাতি : জনপ্রতি দুই রাত একদিনে মাত্র দুই হাজার টাকা হলেই যথেষ্ট। অবশ্য এটা নির্ভর করবে আপনার বিলাসিতার উপর।

ভ্রমণ তথ্য: রাতের বাস/ট্রেনে গেলে, সারাদিন ঘুরে আবার রাতেই ঢাকা ফেরা যাবে। ছবির ছৈয়ালঃদে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

Check Also

রান্নাঘরে খুন্তি-কড়াই নিয়ে ঠুকঠাক করতে চান না সাবিলা!

বিনোদন রিপোর্টার: নিতুকে বিয়ে দিতে চাইছে তার পরিবার। কিন্তু সে বিয়ে করতে প্রস্তুত নন। কারণ …

ঈদে ফারিণের লজিং মাস্টার ফারহান!

বিনোদন রিপোর্টার: তাসনিয়া ফারিণদের বাসায় লজিং মাস্টার হিসেবে থাকেন মুশফিক আর ফারহান। দুই বোনকে পড়াশুনা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *