রাউজানে এক পরিবারের ৩ জন বিসিএস ক্যাডার

এম বেলাল উদ্দিন, রাউজান (চট্টগ্রাম) থেকে: চট্টগ্রামের রাউজানে একটি পরিবারের তিনজন সদস্যই বিসিএস ক্যাডার। পরিবারটির আর কোনো পুরুষ সদস্য নেই। থাকলে হয়তো তিনিও বিসিএস অফিসার হতেন। এই পরিবারটি হচ্ছে রাউজান উপজেলার কদলপুর গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নুরুল আলম চৌধুরীর পরিবার। তার তিন পুত্রই বিসিএস ক্যাডার- দু’জন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা এবং একজন শিক্ষাবিদ।
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, সিএজি : নুরুল আলম চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বর্তমানে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল। এটি একটি সাংবিধানিক পদ। রাউজান তথা চট্টগ্রামের আর কোনো লোক কখনো এত উঁচু পদে পৌঁছতে পেরেছিলেন কিনা জানা নেই বলে মন্তব্য স্থানিয় চেয়ারম্যান তসলিম উদ্দিন চৌধুরীর।
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর জন্ম ১৯৫৯ সালের ২৪ অক্টোবর। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে বিকম (সম্মান) ও এমকম এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিংয়ে ডিসটিংশনসহ এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি আইএমএফ ইনস্টিটিউট এবং বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক অর্থনীতি বিষয়ে পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে বিসিএস অডিট এন্ড একাউন্টস ক্যাডারে সরকারি চাকরিতে যোগদান করে কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টস, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স এবং অর্থ বিভাগের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী সরকারের আর্থিক সংস্কার কর্মসূচি, সরকার পদ্ধতি, বাজেট, আর্থিক হিসাব এবং অডিট ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন এবং বাংলাদেশে প্রথম পিপিপি নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাবলিক ফাইন্যানশিয়াল ম্যানেজমেন্ট (পিএফএম) সংস্কার কর্মসূচির পরামর্শক হিসেবে বিশ্বব্যাংক ও ডিএফআইডি প্রকল্পেও কাজ করেছেন তিনি। মুসলিম চৌধুরী অতিরিক্ত সচিব থাকাকালীন অনলাইন বেতন নির্ধারণ এবং সরকারি কর্মচারী ও পেনশনার ডাটাবেইজ তৈরির জন্য ‘জনপ্রশাসন স্বর্ণপদক ২০১৭’ লাভ করেন।
তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক, সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এবং ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লিমিটেডের সরকার মনোনীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সার্ক ডেভলাপমেন্ট ফান্ড এর পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন, যার হেড কোয়ার্টার ভুটানের থিম্পুতে অবস্থিত। এছাড়া আইসিএমএবি এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের কাউন্সিল মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সরকারি মালিকানাধীন বৃহত্তম অবকাঠামো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিআইএএফএলের প্রথম এমডি এবং সিইও ছিলেন। মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী সরকারি ও ব্যক্তিগত সফরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, নেপাল, জাপান, ভুটান, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, হংকং, মিয়ানমার, কেনিয়া, মরক্কো ভ্রমণ করেছেন। মুসলিম চৌধুরীর স্ত্রী সাবিনা হক একজন শিক্ষিকা। তিনি দুই সন্তানের গর্বিত পিতা।
মোহাম্মদ মোহসিন চৌধুরী : নুরুল আলম চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র মুহাম্মদ মোহসিন চৌধুরী ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাব বিজ্ঞানে বি. কম (অনার্স) ও এম.কম ডিগ্রি লাভ করেন। চাকরি জীবনের প্রথমে তিনি সোনালী ব্যাংক ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে চাকরি করেন। পরে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৩ সালে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন। তিনি সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট, এনডিসি, ইউএনও, এডিএমসহ বিভিন্ন পদে চাকরি করেন। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন। মোহসিন চৌধুরীর ভদ্রতা, সততা, বিনয়, ন¤্রতা, অমায়িক ব্যবহার এবং পরোপকারের জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধি রয়েছে।
মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম চৌধুরী : শিক্ষাবিদ নুরুল আলম চৌধুরীর তৃতীয় ও কনিষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম চৌধুরী পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর সামনেও বিসিএস অফিসার হয়ে বড় দু’ভাইয়ের মত প্রশাসনের লোভনীয় চাকরিতে যোগদান করে সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। তিনিও বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন বটে কিন্তু জনপ্রশাসনের চাকরি তাঁকে আকর্ষণ করতে পারেনি। ১৯৬৮ সালের ১ জানুয়ারী মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম। তিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ-এ বিএ অনার্স ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ১৯৯৫ সালে শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেন এবং বিভিন্ন সরকারি কলেজে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতার পর নিজ জেলা চট্টগ্রামে বদলি হয়ে এসে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের প্রাচীনতম কলেজটির উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শরীয়াহ্ বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষাব্রতী নুরুল চৌধুরীর দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ফজিলতুন্নেছা গৃহিণী। ছোট মেয়ে জেবুন্নেছা বেগম মাস্টার্স করে নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন এখলাছুর রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
বংশগত সিলসিলা : মুসলিম চৌধুরী, মোহসিন চৌধুরী ও মোজাহিদুল ইসলাম চৌধুরী-রাউজান উপজেলার ৮নং কদলপুর ইউপির এলাকাটি যাঁর নামে ‘কদলপুর’ নামকরণ হয়েছে, সেই কদল খান দেওয়ানের বংশেরই উত্তরপুরুষ। এই বংশ বহু কৃতী পুরুষের জন্মে ধন্য হয়েছে। সমগ্র এলাকাটিতে কদল খানের বংশধরদের স্থাপিত নানা কীর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আছে বড় বড় দিঘী, হাট-বাজার, কবরস্থান এবং বহু পুরনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। কদল খানের প্রপৌত্র শেখ দৌলত গাজী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *