সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা: যেভাবে হবে সেন্ট্রাল এডমিশন টেস্ট (সিএটি)।

অনলাইন ডেস্ক : শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমস্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এরমধ্যে ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৬০ হাজার আসনের বিপরীতে লড়বেন ৮ লাখেরও অধিক শিক্ষার্থী। এই পরীক্ষার আগে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত বা গুচ্ছ পরীক্ষা নেয়া হয়। আর চলতি শিক্ষাবর্ষ (২০২০-২১) থেকে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এই পরীক্ষাটিকে প্রথমে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা বলা হলেও পরবর্তীতে এই পরীক্ষার নাম দেয়া হয় ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা’। ইংরেজিতে বলা হয়, সেন্ট্রাল এডমিশন টেস্ট (সিএটি)।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য একটি কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আলাদা আলাদা বিভাগ অনুযায়ী তিন ধাপে পরীক্ষা হবে। তবে এই পরীক্ষায় থাকছে না দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেবার সুযোগ। যদিও বিষয়টি এখনো চুড়ান্ত হয়নি। পরীক্ষার পর পরীক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর ও মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে। আর তালিকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেছে নেবেন শিক্ষার্থী। কোন বিশ্ববিদ্যালয় যদি মনে করে অধিক নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের শুধু ভর্তি করাবেন তবে সে অনুযায়ী তাদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। পুরো অনলাইন এই প্রক্রিয়ায় থাকবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলের সিজিপিএ থেকে নম্বর বা পয়েন্ট। এখন পরীক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা বিষয় ও আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আবেদন করতে হয়। এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন পরীক্ষার্থীরা পছন্দমতো এলাকায়। ফলে যাতায়াত, আবাসন, খাবারসহ নানা ভোগান্তি থেকে রেহায় পাবেন। ৫০ নম্বরের সংক্ষিপ্ত ও ৫০ নম্বরের বহুনির্বাচনী পরীক্ষা হবে। ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হবে নভেম্বরের মধ্যে।

এদিকে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত না জানালেও দ্বিমত প্রকাশ করছে না তারা। চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান (ঢাবি), অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম (বুয়েট), অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম (জাবি) ও অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার (চবি) জানিয়েছেন, একাডেমিক কাউন্সিলের পরেই তারা তাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।

ইউজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়, চলতি মাসেই জানাতে হবে তাদের সিদ্ধান্ত। এরপর মার্চ মাস থেকে কিভাবে চলবে এই পদ্ধতি তা নিয়ে কাজ শুরু করবে ইউজিসি। ১২ই ফেব্রুয়ারি ইউজিসি’র কার্যালয়ে তাদের এক বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’দের নিয়ে একটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠক শেষে ইউজিসি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ চলতি বছরেই কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান। এছাড়াও তিনি বলেন, কোন বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিমত পোষণ করেননি। কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, আমি আশাবাদী সকল বিশ্ববিদ্যালয় এই কার্যক্রমে আসবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরীক্ষায় অনেক পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করবে। আমরা চাই পুরো প্রক্রিয়াটি সুন্দরভাবে হোক।

কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, একেকজন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য সকালে কুমিল্লা বিকেলে নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতে হয়। তাই প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা নিলে যাতায়াত কষ্ট লাঘব হবে। অন্যদিকে খরচও বেঁচে যাবে। কোন পরীক্ষার্থী অসুস্থ বা অন্যকোন সমস্যার কারণে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি বিষয়ের ভালো ও খারাপ দিক রয়েছে। বাসে দুর্ঘটনা হয়, তাই বলে কি বাসে যাতায়াত করা বন্ধ করে দেবো? কিভাবে বাসের দুর্ঘটনা কমানো যায় সেদিক লক্ষ্য রেখে যাতায়াত করতে হয়। সবদিক বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা নেয়া ভালো।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের ভিসি অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি এটাকে স্বাগত জানাই। কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিমতের কোন সুযোগ নেই। আমাদের শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ করতে এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার কোন বিকল্প নেই বলে আমি মনে করি।

এই পরীক্ষায় কেন্দ্রীয়ভাবে একটা পুল তৈরি করা হবে, সেই পুল থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করবে এবং এর ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিশ্ববিদ্যালয় সবাই উপকৃত হবে বলে মন্তব্য করেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার অবশ্যই পজিটিভ নেগেটিভ দুটোই আছে। তবে আমি এই পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এর ফলে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের ভোগান্তি কমে যাবে। পাশাপাশি আর্থিকভাবে অনেকটা সাশ্রয়ী হবে।

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) রেজিস্ট্রারার অধ্যাপক ড: মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। সুবিধা-অসুবিধা গুলো আমাদের চিন্তা করতে হবে। বরং আমার প্রশ্ন আমি এটাকে কিভাবে সুরক্ষিত রাখবো। কারা কারা এখানে যুক্ত থাকবেন। এর জন্য সামগ্রিক একটা পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা করতে হবে। এটা সুবিধা হল ছাত্রদের খরচটা কমে যাবে এবং সেই সঙ্গে অসুবিধা হল একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবনে একবারই এই পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পাবে। একজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হলো অথবা পরিবারের কোন সমস্যার কারণে ভালো জায়গায় গুলোতে পরীক্ষা দিতে পারলনা সে মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও পিছিয়ে যাবে। সরকার চিন্তা করেছিল গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জেনারেল বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা নেয়ার। আমি মনে করি, যেকোনো একটা পদক্ষেপ নেয়ার আগে সার্বজনীন একটা নীতিমালা নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পপুলেশন সায়েন্স এন্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম খান বলেন, ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত সব হয় একাডেমিক কাউন্সিলে (এসি)। কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ব্যাপারে এখনো কোন সভা হয়নি। তাই এ ব্যাপরে এখন কিছু বলতে পারছি না। তবে আমরা চাই, যে কোন সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের উপকার হোক।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর বলেন, কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার পজিটিভ নেগেটিভ দুটি দিকই রয়েছে। এই পরীক্ষার ফলে শিক্ষার্থীদের হয়রানি থাকবে না। তবে এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি কার্যক্রমে নিজস্ব স্বকীয়তা হারাবে বলে মনে করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে ভিসি ছাড়াও পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ডিনসহ অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন ছিল। বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে এই ধরনের সিদ্ধান্তে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান বৃদ্ধির কথা বলে আসছি এতোদিন। এখন শিক্ষার্থীদের সাময়িক কষ্ট লাঘবে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সুষ্ঠু ভাবে তা বাস্তবায়ন করা না গেলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় তার বিরূপ প্রভাব পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *