হাওরের গায়েবী মসজিদ

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম: গত বছর যখন বিশ্বের অন্য দেশের মতাে বাংলাদেশেও চলছিলো মহামারি সংক্রমণ রোধে লকডাউন। তখন ছিলো বাংলা মাসের বৈশাখ আর আরবী মাসের রমজান। হাওরে চলছিলো ধুমছে ধান কাটার মৌসুম। ওই অবস্থায় কৃষকদের কি হালচাল,তা জানার ও দেখার জন্য প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মটরবাইকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম ছুটলাম। কলা বেচা হবে সাথে রথও দেখা হবে। যেতে যেতে মাঝেমধ্যে নানান জায়গায় ব্রেক কষে আলাপ জমিয়েছিলাম স্থানীয়দের সঙ্গে।

লকডাউনের সুফল-কুফল সম্পর্কে তাদের ধ্যানধারণা জানার চেষ্টা করেছি। ধারণা পেতে পেতে সময় গড়িয়ে রাত ৮টায় পৌঁছি কিশোরগঞ্জ। শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের পাশে থাকা পূর্বপরিচিত এক মাদ্রাসার মেহেমানখানায় উঠি। দ্রুত সাফসুতর হয়ে এশা ও তারাবিহ নামাজে অংশ নিই। রাতটা কাটিয়ে সকাল সকাল বালিখোলা ঘাট দিয়ে ফেরীতে পারাপার হই। ধনু নদীর সৌন্দর্যও কম যায় না। ফেরী হতে নেমে কিছুটা পথ আগাতেই যেন মনে হলো, আমি কোনো সড়কে নেই। রয়েছি বিমানবন্দরের রান ওয়েতে। ধুধু হাওরের বুকে মসৃণ পিচঢালা পথ। যেটাকে আমরা বাইকাররা চলতি কথায় মাখন মারা রোড বলে থাকি। মূলত এটাকে কেতাবি ভাষায় মারসেবল রোড বলা হয়ে থাকে। পথের নজর কাড়া সৌন্দর্যে বাইকের গতি বাড়তে বাড়তে নয়াগাঁও গ্রামে ব্রেক। সেখানকার ক্ষেতগুলোতে কৃষক- মজুরদের ধান কাটা চলছিলো। যাকে বলে কৃষকদের নতুন ধান গোলায় তোলার উৎসব।

আল্লাহর দুনিয়ায় তার উত্তম সৃষ্টি মানুষের রয়েছে নানাবিধ কর্মজীবন। কেউ জন্মগত ভাবেই বিশাল ধনি। আবার কারওবা দিনমজুরী দিয়েই যায় জীবন। আহারে জীবন। মাথার উপর কাঠ ফাটা রোদ। তবুও চোখেমুখে হাসি।

ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে সবচাইতে বেশি পরিশ্রমী ও ত্যাগী মনে হয়, যারা রয়েছেন কৃষি এবং কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মাঠে কাজ করা কৃষকদেরকে সামনাসামনি না দেখলে বুঝা যাবে না তাদের জীবনযাপন কতটা কষ্টকর। ক্ষেত নিড়ানি, বীজ বপণ থেকে শুরু করে একেবারে ফসল বাজারজাত করা পর্যন্ত অক্লান্ত দৈহিক ও মানসিক পরিশ্রম করেই চলছে।

ভ্রমণে মানুষের যাপিতজীবন ও ওসব অঞ্চলের সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের অন্যতম লক্ষ আমাদের দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র। তাইতো লকডাউনে কৃষকের সুখ-দুঃখের গল্প শুনতে ছুটে এসেছিলাম জেলার ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিস্তীর্ণ হাওরের বুকে কাজ করা ধান চাষিদের সান্নিধ্যে। প্রথমেই মিঠামইন উপজেলার নয়াগাঁও এলাকার যে ক্ষেতে নামি,সেখানে দেখি প্রখর রোদে পাকা ধান কেটে তা মাথায় তুলে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে রাখতেছে।

কৃষকদের কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলমান লকডাউনে তারা কী ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তা প্রত্যেকের মুখ থেকে আলাদা আলাদাভাবে শুনি। সেই সঙ্গে এবার কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে কিনা তাও জানার চেষ্টা করি। আলাপচারিতার একপর্যায় কৃষকদের নানান সুখ-দুঃখের গল্প জমে উঠে।

আগেই বলে রাখি, কৃষকদের পেশা তুলে ধরতে গিয়ে আমি কিন্তু অন্যান্য পেশাজীবীদের খাটো করছি না। কারণ যার যার অবস্থান থেকেই সে ওই কাজে পরিশ্রমী। তবে কৃষকদের ব্যাপারটা সম্পূর্ণই ভিন্ন। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। অথচ কৃষকরা আজো অবহেলিত। বঞ্চিত রয়েছে তারা তাদের অধিকারের অনেক সুযোগ-সুবিধা হতেই। এখানকার কৃষকদের উৎপাদিত ধান ছিলো রাতা ও হিরা।

স্থানীয়ভাবে রাতা ধান হতে ছাঁটাই করা চালকে জামাইমুখিও বলে থাকে। এটা মূলত পোলাওর চাল। হিরা হলো মোটা ভাতের চাল। ফসলের মাঠে কাজ করা অধিকাংশ কৃষকেরই কড়া অভিযোগ ছিলো লকডাউনের ব্যাপারে। উনাদের ভাষ্য মতে লকডাউন তাদের বিশাল আর্থিক ক্ষতি করেছে। এমনিতেই প্রাকৃতিক বৈরীতার কারণে কারো কারো ফসলে চিটাও হয়েছে। সেই সাথে ধান কাটার মাত্র দুইদিন আগে বয়ে যাওয়া প্রবল বাতাসেও পাকা ধানের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলন হয়েছিলো প্রচুর। কিন্তু শেষ মুহূর্তের প্রাকৃতিক দুর্যোগ তা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। সব মিলিয়ে এবার তারা আশানুরুপ ফসল ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারবে না। এসব শুনে সত্যিই যে কারোরই মন খারাপ হয়ে যাবে।

এরপর ছুটে যাই ইটনার পথে। যেতে যেতে আসনপুর গ্রামে গিয়ে থামি। কথা হয় কৃষকদের সঙ্গে। তারা ২৯ ও ৫৮ জাতের ধান তুলেছে। তাদের ফসলও বেশ ভালো হয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে আন্দাজ করা যায়, আসনপুরেরর ধান চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবে। আশার কথা শুনতে পেরে আমাদের মনটাও কিছুটা ভাল হলো। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবারো ছুটছি।

এবার দেখব ইটনা উপজেলার প্রাচীনতম শাহী মসজিদ। যেটাকে স্থানীয়রা গায়েবী মসজিদ হিসেবে চিনে থাকে। যেতে যেতে উপজেলা সদর বড়হাটি গ্রামের গায়েবী মসজিদের সামনে পৌঁছি। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট কারুকার্যখচিত মসজিদটি প্রথম দর্শনেই মনের ভিতর অন্যরকম ভাললাগার দোল খেলে। মোঘল স্থাপত্য শৈলী অনুকরণে মসজিদটির নক্শা তৈরী করা।

ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, প্রায় ৪২৫ বছরের পুরনো ইটনা শাহী মসজিদ। বারংবার অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে এর নির্মাণকাল লেখার শিলালিপি পলেস্তারের নীচে ঢেকে যাওয়ায় সঠিক সন-তারিখ জানা যায়নি। মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বারো ভূইয়াদের প্রধান ঈশা খাঁর সভাসদ মজলিশ দেলোয়ার। মসজিদ সম্পর্কে কথা হয় স্থানীয় এক মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানালেন মসজিদটির নামকরণ
নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। অত্র অঞ্চলের বাসিন্দারা ইটনা শাহী মসজিদটিকে গায়েবী মসজিদ হিসেবেই মনে করে থাকে।

বর্তমানে মোতোয়াল্লির দায়িত্বে আছেন দেওয়ান শাকিল সাহেব। মসজিদের ভিতরটাও দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যময়। আরো একটা লক্ষণিয় বিষয় হলো মসজিদের ভেতরটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ছাড়াই অবিশ্বাস্য রকমের ঠান্ডা। অথচ সেদিন দেশে ছিলো চরম তাপমাত্র। মসজিদের সামনের অংশে উঠোন আকৃতির বড় বারান্দা রয়েছে।

মসজিদের দৈর্ঘ ২৪ মিটার ও প্রস্থে প্রায় ১০ মিটার। তিনটি দরজা ও মেহরাব সহ শাহী মসজিদটির দেয়ালের পুরত্ব ২ মিটার। ইটনা শাহী মসজিদটি, শতশত বছর যাবৎ মোগল স্থাপনা শৈলীর অনন্য সৌন্দর্য বহন করে আসছে। যেখানে আজো ৫ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনী তোলা হয়। আদায় হয় জমাতের সঙ্গে নামাজ। সবকিছু মিলিয়ে ভাটি অঞ্চলের অনুপম প্রাচীন নিদর্শন শাহী তথা গায়েবী মসজিদটি দেখে পর্যটকরা বেশ পুলকিতই হবেন।

এবার ছুটি অষ্টগ্রামের পথে। পথের মায়ায় মোদের পথেই মন বেঁধে যায়। তাই ক্ষিপ্রগতির বাইকের ব্রেক চলার পথে বারংবার কষতে হয়। বর্ষায় যেখানে থাকে টইটুম্বুর পানি। সাগরের মতো থাকে উত্তাল। আকাশে মেঘ জমলেই হয় অশান্ত। সেখানে আজ শুধু ফসল আর ফসল। এই হলো হাওরের বিভিন্ন মৌসুমে নানান রুপ। বাইক চলতে চলতে অষ্টগ্রাম সীমানায়। এরইমধ্যে সূর্য হেলে পড়েছে। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলো বলে। তাছাড়া রাতের হাওরের পরিবেশ থাকে ভিন্ন। যোগ-বিয়োগ করে নিরাপত্তার স্বার্থে অষ্টগ্রামের ঐতিহাসিক কুতুবশাহ্ মসজিদের দিকে অগ্রসর না হয়ে, বাজিতপুর দিয়ে ঢাকা ফেরার পথ ধরি।

যাবেন কি ভাবে: সায়েদাবাদ ও মহাখালি হতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস চলাচল করে কিশোরগঞ্জ। বালিখোলা ও চামড়া বন্দর ঘাট দিয়ে মিঠামইন, ইটনা এবং অষ্টগ্রাম যাওয়া যায়। ওসব রুটে লেগুনা, সিএনজি চলাচল করে। সবচাইতে বেষ্ট যদি নিজস্ব মটরবাইকে যাওয়া যায়।

থাকা-খাওয়া: রাতে থাকতে চাইলে কিশোরগঞ্জ শহরে ভালমানের হোটেল রয়েছে। খাবারের হোটেল মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন বাজারে রয়েছে।

সতর্কতা: এই ভ্রমণ গল্প লেখকের মটরবাইকের গতির মত যেনো, আপনার বাইকের গতি মাত্রাতিরিক্ত না হয়। লেখক সর্বদা মার্কটোয়াইনের উক্তি অনুসারে তার ভ্রমণান্দ খুঁজে।

টিপস: শুকনো মৌসুমে ধানের গোলা আর বর্ষায় দেখা মিলবে জেলেদের ধরা হরেক মাছের মেলা। নতুন পানির কারণে হাওরের রূপের সঙ্গে পথের সৌন্দর্য হবে মিলেমিশে একাকার।

ছবির ছৈয়াল: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *