হার্নিয়া রোগের সফল চিকিৎসা

যখন শরীরের কোন অঙ্গ আশে পাশের পেশী বা নরম টিস্যুর একটি দুর্বল বা অস্বাভাবিক ছিদ্র ভেদ করে বেড়িয়ে আসে তখন সেই অবস্থা কে হার্ণিয়া বলা হয়। সব চেয়ে সাধারণ প্রকারের হার্ণিয়া হচ্ছে ইঙ্গুইনাল হার্ণিয়াস যা কুঁচকি’র (সরাসরি বা পরোক্ষ ভাবে) সাথে সম্প্রীত, ইনসিশানাল বা ভেন্ট্রাল (অস্ত্রোপচারের পরে পেটে একটি কাটা অথবা দাগ), ফিমোরাল (থাই’এর উপর দিকে, কুঁচকি’র বাইরের দিকে), আমবিলিক্যাল (নাভির কাছে) এবং হিয়াটাল (পাকস্থলীর উপর দিক/ডায়াফ্রাম)। এর লক্ষণ হচ্ছে যেখানে হয়েছে সেখানে ফুলে থাকবে বা ব্যথা হবে। কিছু মানুষের কোন লক্ষণ দেখা যায় না। হার্ণিয়ার চিকিৎসা অস্ত্রোপচার না করেও হোমিওপ্যাথি চিকিৎস টিস্যুগুলি আবার আগের জায়গায় ফিরে যায় ছিদ্র বন্ধ হয়ে যায় তবে কিছুক্ষেত্রে অপারেশন করতেই হয়
হার্ণিয়া হচ্ছে আশে পাশের টিস্যু এবং পেশীর দুর্বল স্থান ভেদ করে একটি অঙ্গ বা চর্বির টিস্যুর বাইরে বেড়িয়ে আসা। এটি স্ত্রনির্বিশেষ হয়, এমন কি বাচ্চাদেরও হয়। স্থূলকায় ব্যক্তিদের এটি বেশি হতে দেখা যায়। হার্ণিয়া সাধারণত হয় যখন অন্ত্র বা উদরকে ঘিরে থাকা পেরিটোনিয়াম উদরের দেওয়ালের কোন ছিদ্র দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসে। বেড়িয়ে আসা অংশটিকে বলা হয় হার্ণিয়া স্যাক যাতে অন্ত্রের অংশ, পেরিটোনিয়াম বা উদরের বাইরের দেওয়াল, পাকস্থলী এবং/অথবা পেটের চর্বি থাকতে পারে।

লক্ষণসমূহ :-

*কুঁচকি বা অণ্ডথলি ফুলে যায়৷
*নাভির একপাশে বা চারপাশে ফুলে যায়৷
*উরুর গোড়ার ভেতরের দিকে ফুলে যায়৷
*আগে অপারেশন করা হয়েছে এমন কাটা জায়গা ফুলে যায়৷

হার্নিয়ার_প্রকারভেদ :-

  • ইঙ্গুইনাল হার্নিয়া:- এই প্রকারের হার্নিয়ায় দেখা যায়, অন্ত্রের অংশবিশেষ উদর ও উরুর সংযোগস্থলে ইঙ্গুইনাল অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে। তখন উদর ও উরুর সংযোগস্থল ফোলা মনে হয়।
    💧* ইঙ্গুইনো-স্ক্রোটাল:- যদি ইঙ্গুইনাল হার্নিয়াতে কোন প্রকার ব্যবস্থা না নেয়া হয় তখনই এধরনের হার্নিয়া হয়ে থাকে। তখন অন্ত্রের অংশবিশেষ নামতে নামতে একেবারে অন্ডকোষে এসে প্রবেশ করে, ফলে অন্ডথলি ফুলে যায়।
    💧 ফিমোরাল হার্নিয়া:- ফিমোরাল হার্নিয়াটা সাধারনত মহিলাদের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে উরুর ভেতরের দিকে স্ফিতি দেখা দেয়।
  • 💧 ইনসিসনাল হার্নিয়া:- পূর্বে উদরের অপারেশন করা হয়েছে এমন অঞ্চলে ইনসিসনাল হার্নিয়া হয়ে থাকে। কেননা অপারেশনের ফলে সেই অঞ্চল খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
    💧* আম্বিলিকাল হার্নিয়া:- আক্রান্ত ব্যক্তির নাভির চারপাশ বা একপাশ ফুলে ওঠে।
    ইনগুইন্যাল হার্ণিয়াকে অবস্থাভেদে আবার কয়েকভাবে ভাগ করা যায়। যথা-
    ক) ইনকমপ্লিট হার্ণিয়া
    খ) কমপ্লিট হার্ণিয়া
    গ) রিডিউসিবল হার্ণিয়া
    ঘ) ইরিডিউসিবল হার্ণিয়া

রোগ_নির্ণয়

কুঁচকির এলাকার ফোলা পরীক্ষার মাধ্যমে ইঙ্গুইনাল হার্নিয়া নির্ণয় করা হয়।

চিকিৎসা :-

চিকিত্সা ছাড়া হার্নিয়া ভাল হয় না, যদিও কয়েক মাস বা এক বছরে হার্নিয়া খুব একটা খারাপ অবস্থায় উপনীত হয় না। অত্যন্ত ব্যথাযুক্ত এক ধরনের হার্নিয়া আছে, যা থেকে তুলনামূলকভাবে সহজে পরিত্রাণ পাওয়া যায় এবং তা স্বাস্থ্যের জন্যও আশঙ্কাজনক নয়, একে রিডিউসিবল হার্নিয়া বলা হয়। আর এক ধরনের হার্নিয়া রয়েছে যা হতে পরিত্রাণ পাওয়া অনেকটাই কষ্টসাধ্য। একে ননরিডিউসিবল হার্নিয়া বলে। এই ধরনের হার্নিয়া জীবনের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে যখন উন্মুক্ত অংশে অন্ত্রের কোনো অংশ আটকে যায় বা রক্ত চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। এই ধরনের হার্নিয়াকে ইনকারসিরেটেড হার্নিয়াও বলা হয়ে থাকে।
🌊হার্নিয়ার দু’ধরনের সাধারণ অপারেশন করা হয়।

শিশুদের মধ্যে হার্নিয়া_কি?

শিশুদের পেটের টিস্যুগুলিতে একটি ছোট্ট খোলা অংশ থাকে যা নাভির মধ্য দিয়ে যেতে পারে। যখন শিশু মায়ের গর্ভের অভ্যন্তরে থাকে তখন এটি মাকে সন্তানের সাথে সংযুক্ত রাখে; জন্মের পরে বা আরও পরে, শিশু যখন পরিপক্ক হয়, পেশীগুলির মধ্যে থাকা এই খোলা অংশ বন্ধ হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে, যেখানে পেশীগুলি পূরণ করে না এবং তাদের বৃদ্ধি সম্পূর্ণ করে না, ঐ অঞ্চলে একটি ছোট ফাঁক তৈরি হয়। যদি অন্ত্রের একটি লুপ এই খোলা অংশের মধ্যে দিয়ে চেপে যায় তবে ফলস্বরূপ হার্নিয়া হয়।
শিশু এবং ছোট বাচ্চাদের মধ্যে হার্নিয়ার প্রকারভেদ
হার্নিয়া এমন একটি অবস্থা যেখানে ফ্যাটি টিস্যু বা একটি অঙ্গ আশেপাশের পেশীর প্রাচীরের ফাঁক দিয়ে ধাক্কা দেয়। প্রায়শই, শিশুরা তাদের দেহের অভ্যন্তরে কিছু ছোট ছোট ছোট খোলা অংশ নিয়ে জন্মায়, তবে এগুলি সাধারণত কোন এক সময় বন্ধ হয়। এদিকে, যদি নিকটবর্তী সংযোগকারী টিস্যুগুলি এই খোলা অংশের মধ্য দিয়ে চেপে যায় তবে সেগুলির ফলে হার্নিয়া হয়। শিশু এবং ছোট বাচ্চাদের মধ্যে দুটি সাধারণ ধরণের হার্নিয়া দেখা যায়:
♦১. #আম্বলিক্যালহার্নিয়া নাভির আশেপাশে এই জাতীয় হার্নিয়া দেখা দেয়; কখনও কখনও, নাভিটির আশেপাশে পেটের পেশীগুলি খোলা অংশের সাথে শিশুরা জন্মগ্রহণ করে। পেটের ঝিল্লি বা ছোট অন্ত্রগুলি এই দুর্বল জায়গা থেকে প্রসারিত হতে পারে, একটি নরম ফোলা সৃষ্টি করে যা একটি নাভির বা আম্বলিক্যাল হার্নিয়া হিসাবে পরিচিত। এর আকার ২ সেন্টিমিটার থেকে ৬ সেন্টিমিটারের মধ্যে হয়। সাধারণত, নবজাত শিশুর একটি নাভির হার্নিয়া কোন অস্বস্তি সৃষ্টি করে না এবং ডাক্তার সহজেই এটি পিছনে ঠেলাতে পারেন। পেশী প্রাচীরের ফাঁক দুই বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বেশিরভাগ নাভি হার্নিয়া নিজে নিজেই অদৃশ্য হয়ে যায়। ♦২. ইনগুইনাল বা কুঁচকির হার্নিয়া শিশুদের মধ্যে ইনগুইনাল হার্নিয়ার প্রাথমিক কারণ শিশুর লিঙ্গের উপর নির্ভর করে। পেট থেকে অন্ত্রের একটি অংশ বা ঝিল্লির প্রসার একটি ইনগুইনাল হার্নিয়ার কারণ। ছেলেদের মধ্যে, এই হার্নিয়া কুঁচকির বাইরে এবং অণ্ডথলির মধ্যে প্রসারিত হতে পারে – এটি সেই গ্রন্থি যা অন্ডকোষ ধারণ করে। মেয়েদের ক্ষেত্রে, এই ফোলা অংশটি ডিম্বাশয়ে বা ফ্যালোপিয়ান নল থেকে কুঁচকির মধ্যে প্রবেশ করে এবং যোনির চারপাশের বাইরের ল্যাবিয়া পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। ♦♦শিশুদের মধ্যে হার্নিয়ার কারণগুলি কি কি? সাধারণত যখন শিশুর পেটের পেশীগুলি পুরোপুরি বিকশিত হয় না, এমন সময় হর্নিয়া পাওয়া যায়। অকালজন্মা শিশুদের ক্ষেত্রে, কুঁচকির খোলা অংশের পেশীগুলির বিকাশ হয় না বা তলপেটের চাপ ধরে রাখতে সক্ষম না হওয়ার কারণেই এটি হতে পারে। ♦♦আম্বলিক্যাল হার্নিয়ার কারণগুলি জন্মের সময়, শিশুরা নাভির চারপাশে পেশীর টিস্যুগুলির একটি রিং নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই রিংটি সাধারণত জন্মের আগে বন্ধ হয়ে যায়। এটি বন্ধ না হলে, এই ধরনের অংশ দুর্বল হয়ে যায়, ফলস্বরূপ নাভির বা আম্বলিক্যাল হার্নিয়া হয়। ♦♦ইনগুইনাল হার্নিয়ার কারণগুলি এর প্রাথমিক কারণটি হল একটি থলির গঠন যা ভ্রূণের জন্মের সময় ইনগুইনাল রিংয়ে খোলা অংশে থাকে। এই থলিটি জন্মের সময় নিযে নিজে বন্ধ হওয়া উচিত। তবে যদি তা না হয় তখন থলিটি পেটের পেশীগুলি রিংয়ের মাধ্যমে কুঁচকিতে চেপে ধরে। ছেলেদের ক্ষেত্রে, আটকে থাকা অঙ্গটি অন্ত্রের লুপ করতে পারে, তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে, এটি অন্ত্র বা ডিম্বাশয়ের একটি অংশ হতে পারে। ♦একটি শিশুর মধ্যে হার্নিয়ার লক্ষণ ও উপসর্গ জন্মের পর এবং শৈশবকালে, টিস্যুগুলি কেবল তখনই প্রসারিত হয় যখন কোন শারীরিক চাপ প্রয়োগ করা হয় বা নিজেকে চাপ দেয়। এই পরিস্থিতিতে কান্নাকাটি, কাশি বা হাঁচি হওয়ার উদাহরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ক্ষেত্রে, দৃশ্যমান ফোলা অংশ সাধারণত নিজে নিজে ঠিক হয়ে যায় বা অদৃশ্য হয়ে যায়। এই সময় একটি হার্নিয়া ক্ষতিকারক নয় এবং এটি কমানো যেতে পারে। ♦১. আম্বলিক্যাল হার্নিয়া আম্বলিক্যাল হার্নিয়া শিশু পরিপক্ক হওয়ার সাথে সাথে নিজে থেকেই অদৃশ্য হয়ে যায়; কিছু ক্ষেত্রে যেখানে এটি আটকে থাকতে পারে। লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে জ্বর, কোষ্ঠকাঠিন্য, তীব্র পেটে ব্যথা, বমি বমিভাব, লালভাব, বিবর্ণতা এবং একটি ফুলে যাওয়া বা গোলাকার পেট। ♦২. ইনগুইনাল হার্নিয়া ইনগুইনাল হার্নিয়াতে, পিণ্ডটি অদৃশ্য হয় না, তবে পরিবর্তে খোলা অংশে আটকে যায় এবং সারা সময় ফুলে থাকে। লক্ষণ হিসাবে, শিশু কান্না থামায় না কারণ সেই পিণ্ড একটি শিশুর পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে। শিশুদের মধ্যে আরও একটি লক্ষণ হল হঠাত কুঁচকির অঞ্চলটি ফুলে যেতে শুরু করে। একটি হ্রাসপ্রাপ্ত হার্নিয়ার ক্ষেত্রে, শিশুটির খিঁচুনি হয় তবে অন্যথায় অদৃশ্য হয়ে গেলে ফোলাভাব উপস্থিত হয়। স্ট্রাঙ্গুলেটেড বা অবরুদ্ধ হার্নিয়ার ক্ষেত্রে শিশুর ব্যথা হতে পারে, ঘ্যানঘ্যানে হতে পারে, বমি হতে পারে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁদতে পারে।

♦# হার্নিয়া_নির্ণয়
হার্নিয়ার নির্ণয় ডাক্তারের পক্ষে একটি সহজ পদ্ধতি। চেকআপ চলাকালীন, তিনি সন্তানের পেট, তলপেট এবং উরুর মধ্যবর্তী অঞ্চল, কুঁচকির উভয় দিক এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে অন্ডথলি পরীক্ষা করেন। যখন শিশু কাশি, কান্নাকাটি বা খিঁচুনি হয় এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন কিনা তা স্থির করে এবং ফোলাভাবটি প্রসারিত হচ্ছে কিনা তা তিনি পরীক্ষা করেন। তিনি দেখবেন যে হার্নিয়াকে ভিতরে ঢোকানো যায় কিনা এবং এটি আটকা পড়েছে কিনা। জটিলতাগুলি যাচাই করার জন্য তিনি পেটে একটি এক্স-রে ও আল্ট্রাসাউন্ড করতে পারেন এবং সংক্রমণের জন্য পরীক্ষা করতে একটি রক্ত ​​পরীক্ষা লিখে দিতে পারেন।

হোমিওপ্যাথি_চিকিত্সা :-

হানিয়োব্যাফি :- এ পদ্ধতিতে আপনার সার্জন আপনার কুঁচকিতে একটা ইনসিশন দিয়ে বেরিয়ে আসা অন্ত্রকে ঠেলে পেটের মধ্যে ফেরত পাঠান। তারপর দুর্বল বা ছেঁড়া মাংসপেশি সেলাই করে ঠিক করে দেন। অপারেশনের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনি চলাফেরা করতে পারবেন। তবে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে আপনার চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

হানিয়োপ্লাস্টি :- এ পদ্ধতিতে আপনার সার্জন কুঁচকি এলাকায় এক টুকরো সিনথেটিক মেশ লাগিয়ে দেন। সেলাই, ক্লিপ অথবা স্টাপল করে এটাকে সাধারণ দীর্ঘজীবী রাখা হয়। হার্নিয়ার ওপরে একটা একক লম্বা ইনসিশন দিয়েও হার্নিয়োপ্লাস্টি করা যেতে পারে। বর্তমানে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে, ছোট ছোট কয়েকটি ইনসিশন দিয়ে হার্নিয়েপ্লাস্টি করা হয়।

এ রোগ এবং এর চিকিৎসা বিষয়ে প্রফেসর ডা. পি বি ভট্টাচার্য্য বলেন, হার্নিয়া নির্মূলের কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে হোমিওপ্যাথিতে। যে ধরনের হার্নিয়াই হোক না কেন হোমিও চিকিৎসায় আক্রান্ত অঙ্গটি ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে পূনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসে। কাজেই কয়েক মাস সময় লাগলেও ধৈর্য্য ধরে হোমিও চিকিৎসা নেয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। কেননা অপারেশান করলে সাধারণত কয়েক বছরের মধ্যে রোগটি আবার ফিরে আসতে দেখা যায়। তাই হার্নিয়া যে পর্যায়েই থাকুক না কেন অভিজ্ঞ একজন হোমিও ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে এবং যথাযথ চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রফেসর ডা. পি বি ভট্টাচার্য্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *