২৭ বসন্তে দে -ছুট ভ্রমণ সংঘ

সময়টা ১৯৯৩। বয়সে তরুণ। দেশের জন্য কিছু করার সব সময়ই মনে চাইতো। কিন্তু কি করা? আবার কোনাে কিছু করতে গেলেই সবাই বলে- এটা হবে ওটা হবে না। তবে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সাথে ছিলেন ছোট বেলার চার বন্ধু। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলেন আমাদের দেশের আনাচে-কানাচে থাকা স্রষ্টার নিদর্শন কে খুঁজে বের করে মানুষের সামনে তুলে ধরবেন। বন্ধুরা নিশ্চয়ই ভাবছেন এতক্ষণ আমি কার কথা বলছি । আমি বলছি মো. জাভেদ হাকিমের কথা , তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ আজ হাটি হাটি পা পা করে ছাব্বিশটি বছর পাড়ি দিয়ে সাতাশ বসন্তে পা দিয়েছে । দীর্ঘ দিনের পথ চলায় আজ ‘দে ছুট ভ্রমণ সংঘ’ বাংলাদেশের অন্যতম একটি ভ্রমণ সংগঠন।
ভ্রমণ বা ট্রাভেল শব্দটার উৎপত্তি হয়েছে আদি ফরাসি শব্দ travail থেকে। মেরিয়াম ওয়েবস্টার ডিকশনারি অনুসারে যতদূর জানা যায় ভ্রমণ শব্দটার ব্যবহার শুরু হয় চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে। সেখানে এটাও বলা আছে যে ভ্রমণ শব্দটা প্রথমে আদি ফরাসি শব্দ travailler (যার মানে পরিশ্রমের সাথে কাজ করা) হয়ে পরবর্তীতে ইংরেজি শব্দ travailen, travelen (যার মানে যন্তণা, শ্রম, সংগ্রাম, ভ্রমণ) এর মধ্য দিয়ে উৎপত্তি লাভ করেছে। ইংরেজিতে এখনও মাঝে মাঝে travail এবং travails শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়, যার মানে সংগ্রাম। Simon Winchester তার বই The Best Travelers’ Tales (2004) এ উল্লেখ করেছেন, travail এবং travel দুটো শব্দই আমাদের সামনে আরও প্রাচীন একটা ব্যাপার তুলে ধরে যেটা হলো tripalium( ল্যটিন ভাষায় যার মানে “৩ টি পুরস্কার”) নামক প্রাচীন রোমানদের ব্যবহৃত টর্চার করার যন্ত্র। এটাতে আসলে প্রতিফলিত হয় প্রাচীনকালে ভ্রমণে অনেক কষ্ট এবং প্রতিকূলতা ছিলো, সাথে travailler শব্দটার কষ্টকর জ্ঞাত্যার্থও প্রকাশ করে। দে ছুট ভ্রমণ সংঘ একটি সু-শৃঙ্খল স্বেচ্ছাসেবক ভ্রমণ সংগঠন। যার অর্থায়ন নিজেদের মধ্য থেকেই সংগৃহিত। দে ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণের পাশাপাশি দুঃস্থদের ত্রাণ দেয়া সহ নানা রকম সমাজসেবামুলক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে থাকে। লক্ষণীয় যে এখনকার তরুণ প্রজন্মের প্রায় সবাই চায় সেবামুলক কার্যক্রমে অংশ নিতে। দেশের জন্য কিছু করতে। এখন বলি দে ছুট ভ্রমণ সংঘের সফল রূপদাতা জাভেদ হাকিমের কথা।

জাভেদ হাকিম দীর্ঘ দিন ধরে জড়িত আছেন ভ্রমণ সাহিত্যের সাথে । ভ্রমণ থেকেই হয় ভ্রমণ কাহিনী। কিন্তু ভ্রমণকারীদের সকলের হাত দিয়ে নয়।’ অন্নদাশঙ্করের এই কথা টেনে বলা যায় ভ্রমণ সাহিত্য সবাই হাজির করতে পারে না। সাহিত্য যেমন নানা অর্থ প্রকাশক ভ্রমণ রচনাও নানা ধাঁচের। যে-ভ্রমণ রচনা আকর্ষণীয় পাঠযোগ্যতায়, জীবন পর্যবেক্ষণে, প্রকৃতি অবলোকনে, এবং বারংবার পড়ার কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, সেটিকেই বলা চলে ভ্রমণ-সাহিত্য। বেড়ানোর প্রসঙ্গকথা হলেই চলবে না, সাহিত্যের স্বাদ চাই, তবেই আসে বেড়ানোর মতো, সাহিত্যপাঠে হাওয়াবদলের স্বাদ। সেই দিক বিচারে আজকের প্রজন্মের মাঝে জাভেদ হাকিম বেশ জনপ্রিয়। জাভেদ হাকিম সেই সপ্তম শ্রেণীতে প্রথম ১০ টাকা করে চাঁদা তুলে বন্ধুদের সঙ্গে জোট বেঁধে ঘোরাঘুরি শুরু করলেও মূলত ১৯৯৪ সালেই প্রথম ঢাকা শহরের গন্ডি পেরিয়ে শৈশবের বন্ধদের সঙ্গে রাঙ্গামাটি ভ্রমণের মাধ্যেমে দে-ছুট এর আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। দে ছুট ভ্রমণ সংঘের মূল উদ্দেশ্য অচেনাকে চেনা অজানা জানা আল্লাহ পাকের সৃষ্টির নিদর্শন দেখা অন্যদেরকেও উৎসাহীত করা । বর্তমানে তাদের দলে টগবগে তারুণ্য সহ যুবক, বৃদ্ব সবাই আছে। ভ্রমণ মানুষের মন মানসিকতাকে করে মহান।উপযুক্ত শিক্ষা লাভের বিশাল মাধ্যম হলো ভ্রমণ।এর বিকল্প নেই। তাই তরূণদের জন্য সুযোগ করেই ভ্রমণে বের হতে হবে।তবে সেই ভ্রমণ হতে হবে প্রকৃতি হতে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। দলবেঁধে গেলাম আর হৈ হুল্লর করে ফিরে এলাম এইটা কোন ভ্রমণের পর্যায় পড়ে না। তরূণদের জন্য পাহাড় ভ্রমণ হতে পারে নৈতিক শিক্ষা লাভের মহা মাধ্যম। জাভেদ হাকিম মতে আমাদের দেশে পর্যটন শিল্প বিকাশের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হল এ দেশে ভালোমানের হোটেল রুম ভাড়া নিউইয়র্ক সিটির চাইতেও বেশী। যা হতভম্ব হয়ে যাবার মত ব্যাপার। খাবারের মান তেমন ভালো মিলে না। পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবেন সেখানে উটকো হকার আর দোকানীদের অযাচিত অসাধাচারন । সাইট সিনের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।ফলে জনসংখ্যা কম হলে পকেটের টাকা বেশ খরচ হয় তাই অনেক সময় মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন ভ্রমণে বের হতে চান না। তাই পর্যটন শিল্প বিকাশে প্রথমেই চাই তরূণ শ্রেণীর সম্পৃক্ততা। দ্বিতীয়ত চাই যাঁরা দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায় নতুন কিছু দেখার বাসনায় তাদের জন্য কম খরচে ঘুরার ব্যবস্থা করে দেয়া। তৃতীয়ত চাই মুনাফার পাশাপাশি সেবার মানসিকতা রয়েছে এরকম হোটেল মোটেল জোন করা। জাভেদ হাকিম বলেন দে ছুট ভ্রমণ সংঘ এর পরিচালনায় যাঁদের অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকি তাদের মধ্যে প্রথমেই আমার প্রতিষ্ঠা কালীন বন্ধুমহল। এর পর বিভিন্ন পত্রিকার ফিচার সম্পাদক ও সহ সম্পাদক মহোদয়রা। এখানে একজনের নাম না উল্লেখ করলেই নয় জনকণ্ঠর ফিচার সম্পাদক শ্রদ্ধেয় শ্রী তাপস মজুমদার তিনি আজ প্রায় ১৪ বছর যাবত আমাকে ঘুরাঘুরি ও ভ্রমণ গল্প লেখা এবং তা প্রকাশে বেশ সহযোগিতা করে আসছেন। দে ছুট ভ্রমণ সংঘের এতটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার পিছেন যে বিষয়য় গুলো মূল মন্ত্র হিসেবে কাজে আসছে তা হলো আমার দৃঢ় মনোভাব, ভ্রমণে সবার যা খরচ হবে আমারো তাই খরচ চিফ হিসেবে আর্থিকভাবে কোন সুযোগ না নিয়ে বরং নির্বিঘ্ন ভ্রমণ উপহার দেয়ার জন্য অনেক সময় অন্য সবার চাইতে নিজের টাকা বেশী খরচ করা। যে কোন অনুষ্ঠান বা ভ্রমণ শেষে হিসাব বুঝিয়ে দেয়া সহ আরো কিছু বিষয় যেমন কোন ক্ষমতাধর ব্যক্তি; সে যদি আমার কাছের বন্ধুও হয় তবুও তার কোনো অনিয়ম মেনে নেয়া হয় না ফলে দে ছুট আজ সাতাশে শে পা দিয়েছে। জাভেদ হাকিম সংগঠনের সবার প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামীতেও তারা যেন দে-ছুটকে এগিয়ে নিয়ে যান তথা দেশের পর্যটনশিল্প উন্নয়নের জন্য নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিজেদেরকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে পারেন। সেই সঙ্গে তিনি দে-ছুট ভ্রমণ সঙ্গ সংগঠনকে সহযোগিতা করার জন্য, দেশের সকল প্রিন্ট ও অনলাইন পোর্টাল মিডিয়ায়র সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদকদের প্রতি আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ।

সুমন্ত গুপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *